অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণে হচ্ছে ‘ভাগাভাগি’র বিধিমালা

 

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণে হচ্ছে ‘ভাগাভাগি’র বিধিমালা

 

 

হিন্দু নিউজ :

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধান রেখে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এই বিধিমালা চূড়ান্ত করা হলে প্রকৃত অংশীদাররা বঞ্চিত হবেন। সমাজে দেখা দেবে বৈষম্য। মন্ত্রণালয়ের আইন-৪ শাখা থেকে সম্প্রতি খসড়া বিধিমালাটি তৈরি করা হয়েছে। এ খবর সংশ্নিষ্ট সূত্রের।

খসড়া বিধিমালার ৪ নম্বর ধারায় সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় ১৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় চাকরিরত দশ বা তার চেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত সমবায় সমিতিকে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য এই জমি স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, মহানগর এলাকায় সর্বোচ্চ ৬৬ শতাংশ এবং জেলা ও উপজেলা সদরে সর্বোচ্চ এক একর (একশ’ শতাংশ) অকৃষি জমি বাজারমূল্যে পরিশোধের শর্তে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে। মহানগর এলাকায় জনপ্রতি সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ আট শতাংশ জমি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

খসড়া বিধিমালা সম্পর্কে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন। সমকালকে তিনি বলেন, বিধিমালা খসড়ার ফাইল তার কাছে এলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। তিনি বলেন, বংশপরম্পরায় প্রকৃত অংশীদার যাতে এই জমি পায়, সে লক্ষ্যে কাজ করছে তার মন্ত্রণালয়। প্রকৃত অংশীদারদের এখনও অর্পিত সম্পত্তি বন্দোবস্ত দেওয়ার কাজ শুরু করতে না পারা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ভূমির কাজ অত্যন্ত কঠিন। তবে এটি প্রক্রিয়াধীন। সময় হলে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বিশেষজ্ঞ মহলের ভাষ্য- এই ধারাটি সন্নিবেশ করার ক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের যারা এই খসড়াটি তৈরি করেছেন, তাদের স্বেচ্ছাচারিতারও প্রতিফলন ঘটেছে। তাদের মতে, এই বিধিমালা বাস্তবায়ন করা হলে জমির উত্তরাধিকারসহ অংশীদার ও নিরীহ হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করা হবে।

অর্পিত সম্পত্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবুল বারকাত সমকালকে বলেন, আইনগতভাবে যারা দাবিদার- তারাই ওই জমি পাবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিসেবে টেনে আনা অন্যায্য, অযৌক্তিক। কোনো দাবিদার না থাকলে জমি থাকবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। তখন সরকার ইচ্ছা করলে নামমাত্র মূল্যে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধা ও ভূমিহীনদের ওই জমি বন্দোবস্ত দিতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধান রাখা হলে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হবে বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

খসড়া বিধিমালাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন-৪ শাখার যুগ্ম সচিব মো. কামরুল হাসান ফেরদৌস সমকালকে বলেন, বিধিমালাটি সহসাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে। গত ১ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তার কাছে প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি রেগে গিয়ে বিষয়টি কোথায়, কার কাছ থেকে জানা গেল তা জানতে চান। ধারাটি যথাযথ হয়েছে কি-না- এই প্রশ্নের জবাবে যুগ্ম সচিব বলেন, ধারাটি থাকবে কি থাকবে না তা ওপরের মহল সিদ্ধান্ত নেবে।

সূত্র জানায়, ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন প্রণয়ন করা হয়। বংশপরম্পরায় প্রকৃত অংশীদারদের মাঝে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে গত ১৭ বছরেও আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি যে খসড়া বিধিমালাটি তৈরি করা হয়েছে, সেটিতে বঞ্চিত হিন্দু জনগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী নানা ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খসড়া বিধিমালার ৪ নম্বর ধারার (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়, সংশ্নিষ্ট অংশীদার, দাবিদাররা বাজার মূল্যের দশ শতাংশ কমে মূল্য পরিশোধ করে কৃষি, অকৃষি জমি স্থায়ী ইজারা-বন্দোবস্ত নিতে পারবেন। অর্থাৎ মোট মূল্যের ৯০ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে তাদের।

এ প্রসঙ্গে আবুল বারকাত বলেন, ৫০-৫২ বছরের ভোগান্তির পর তাদের বিনামূল্যে জমি ফেরত দেওয়ার কথা। এখন অংশীদার, সহঅংশীদারদের কাছ থেকে বাজার মূল্যের ৯০ শতাংশ আদায় করা হলে সেটা হবে অন্যায়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত সমকালকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জমি দেওয়ার প্রস্তাবটি প্রচলিত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইনে বলা হয়েছে, হস্তান্তরকালে যেসব জমির কোনো দাবিদার থাকবে না, ওইসব জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট লিজ গ্রহীতারা অগ্রাধিকার পাবেন। তিনি আরও বলেন, বাজারমূল্যের ১০ শতাংশ কমে ভুক্তভোগীদের জমি হস্তান্তরের ধারাটি আইন পরিপিন্থী। ভূমি মন্ত্রণালয়ের কিছু স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তা জমি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছাকে নস্যাৎ করতে এই কাজ করছেন।

ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ‘ক’ ও ‘খ’ তালিকাভুক্ত সর্বমোট অর্পিত সম্পত্তির পরিমাণ ১১ লাখ ৫২ হাজার ৩২৩ একর। এর মধ্যে ‘ক’ তালিকায় ২ লাখ ২০ হাজার ১৯১ একর ও ‘খ’ তালিকায় জমির পরিমাণ ৯ লাখ ৩২ হাজার ১৩২ একর। মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ক’ তালিকাভুক্ত জমি সংশ্নিষ্ট লিজ (একসনা বন্দোবস্ত) গ্রহীতাদের মাঝে স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দিতে ওই বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় জানায়, ‘ক’ তালিকাভুক্ত মোট জমি ২ লাখ ২০ হাজার ১৯১ একর। এর মধ্যে ১ লাখ ৯ হাজার ৬৮১ একর জমির বিপরীতে ১ লাখ ১৯ হাজার তিনশ’ মামলা দায়ের করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে। ২০১২ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় থেকে গত সাত বছরে ১৫ হাজার ৭২৬ একর জমির বিপরীতে ১৫ হাজার ২২৪টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৩৯ একর জমির বিপরীতে ৭ হাজার ৪৯১টি মামলা নিষ্পত্তি হয় সরকারের পক্ষে। অপরদিকে ৮ হাজার ১৮৭ একর জমির বিপরীতে ৭ হাজার ৭৩৩টি মামলা যায় সরকারের বিপক্ষে। এই হিসাবে ৯৩ হাজার ৯৫৫ একর জমির বিপরীতে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন প্রণয়ন করা হয় ২০০১ সালে। এর পর সরকার পরিবর্তনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর ‘ক’ তালিকাভুক্ত জমির মালিকানা দাবি করে ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানানোর শেষ তারিখ ছিল ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বর্তমান সময়ে ‘ক’ তালিকার জমির আইনগত সমস্যা সমাধানের দাবিতে আবেদন করার সুযোগ নেই।

১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস জারি করে ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু জনগোষ্ঠীর জমিকে ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ওই জমিকে অর্পিত সম্পত্তি উল্লেখ করে ১৯৭৪ সালে নতুন আদেশ জারি করে। পরে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার উত্তরাধিকার ও সহঅংশীদারদের মাঝে জমি ফেরত দিতে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন-২০০১’ প্রণয়ন করে। একই বছরে জমির তালিকা তৈরি করে ৯০ দিনের মধ্যে প্রকাশের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০০২ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সুবিধাজনক সময়ে তালিকা প্রকাশ করার কথা উল্লেখ করে আদেশ জারি করে। এর পর পাঁচ বছরেও তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। ২০০৭ থেকে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে এ নিয়ে কোনো কাজ হয়নি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে আইন সংশোধন করে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করে। পরের বছর ২০১২ সালে প্রকাশ করা হয় তিন পার্বত্য জেলা বাদে সারাদেশের অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ ও ‘খ’ তালিকা। এরপর ২০১৩ সালে আবার আইন সংশোধন করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে ‘খ’ তালিকা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ‘ক’ তফসিলের জমি প্রকৃত উত্তরাধিকারদের মাঝে হস্তান্তর করতে জেলা পর্যায়ে গঠন করা হয় পৃথক ট্রাইব্যুনাল। তখন সংশ্নিষ্টদের তিনশ’ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে বলা হয়েছিল। আইন অনুযায়ী ওই তিনশ’ দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করারও কথা ছিল। অথচ ওই সময়ে পেশ করা আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করা হয়নি।

সুত্র সমকাল ডটকম,

হকিকত জাহান হকি

 

Related posts:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *