ধর্মানুভূতি না ছাই, হিন্দু বাড়ির স্বর্ণঅলংকার জায়গা-জমি লুট করাই আসল লক্ষ্য

ধর্মানুভূতি না ছাই, হিন্দু বাড়ির স্বর্ণঅলংকার জায়গা-জমি লুট করাই আসল লক্ষ্য, হুট করে ক’দিন পর পর এসব নিয়ে গুজুব তৈরী করা হয়, তারপর দল বেঁধে আক্রমণ করে শুরু হয় লুটপাট।

 

ঢাকা: ধর্মানুভূতি না ছাই, হিন্দু বাড়ির সোনাদানা লুট করাই আসল লক্ষ্য, হুট করে ক’দিন পর পর এসব নিয়ে হুজুগ তৈরী করা হয়, তারপর দল বেঁধে আক্রমণ করে শুরু হয় লুটপাট। যারা আক্রমণ করেছে, তাদের অনেককেই চিনি আমি। এরা কেউই শুক্রবার ছাড়া মসজিদের সামনেও যায় না, মোবাইলের দোকানে বসে আড্ডা দেয়, মেয়েদেরকে টিটকারী দেয়, এদের মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও পাবেন খুঁজলে। আর দেখেন, এরাই এখন ধর্মরক্ষায় নেমেছে।’ কথাগুলো এই প্রতিবেদককে খুব আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন স্থানীয় পাগলাপীর স্কুল এণ্ড কলেজের মুসলমান সম্প্রদায়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)।

ফেসবুকে কথিত একটি স্ট্যাটাসের জেরে রংপুরের সদর উপজেলার পাগলাপীর ঠাকুরবাড়ি গ্রামে আগুন দিয়ে লুটপাট হয়েছে হিন্দুদের বাড়িতে। বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে গ্রামের ৩০টি হিন্দু বাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে। স্থানীয়রা জানান, গরু-ছাগলসহ তাদের সব মালামাল লুট হয়েছে। শুক্রবার (১০ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঠাকুরবাড়ি গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলো তাদের বাড়িতে ফেরেনি।

 

শুক্রবার (১০ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রংপুরে পুলিশ ও গ্রামবাসীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় দুইজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩০ জন। শুক্রবার সদর উপজেলার পাগলাপীর শলেয়াশাহ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

এ সময় বিক্ষোভকারীরা হামলা চালিয়ে ঠাকুরপাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের ৮টি বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও ৩০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। পুলিশ ওই এলাকা ঘিরে রেখেছে।

পুলিশ ও গ্রামবাসী সূত্র জানায়, পাগলাপীর শলেয়াশাহ এলাকার খগেন চন্দ্র রায়ের ছেলে টিটু চন্দ্র রায় (৪০) গত ৫ নভেম্বর ফেসবুকে ওই ‘আপত্তিকর স্ট্যাটাসটি’ দেয়। পুলিশ বিষয়টি নজরে নিয়ে গত ৬ নভেম্বর একটি মামলা গ্রহণ করে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় টিটু চন্দ্র রায়কে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালায়। কিন্তু টিটু বিষয়টি আগাম বুঝতে পেরে পালিয়ে যায়।

বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা চলতে থাকে। তবে তিন দিন ধরে পুলিশের পক্ষ থেকে এ নিয়ে উস্কানি না দেয়ার জন্য প্রচারনা চালানো হয়। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে এলাকার বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লিরা সমবেত হন। ঠাকুরপাড়া মহল্লার পার্শ্ববর্তী আটটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজারের অধিক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন।

এক পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ঠাকুরপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় খগেন চন্দ্র রায়, খিরোদ চন্দ্র রায়, সুধির চন্দ্র রায়, অমূল্য রায়, বিধান রায়, বিপুল রায়, কৌশল্লা, সুধীন মোহন্তের বাড়িতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আগুনে টিটু রায়ের তিনটি, সুধীর রায়ের ছয়টি, অমূল্য রায়, বিধান রায় ও কৌশল্য রায়ের দুটি করে ছয়টি, কুলীন রায়, ক্ষিরোধ রায় ও দীনেশ রায়ের একটি করে তিনটি ঘর ভস্মীভূত হয়। এছাড়া লক্ষাধিক টাকার মালামাল ও সোনাদানা লুট হয় বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্থরা।

টিটু রায়ের মা জীতেন বালা কাঁদতে কাঁদতে প্রতিবেদককে বলেন, “শত শত মানুষ আসি তিনটা ঘরোত আগুন নাগে দেলে। চৌকের পলোকে ঘরগুল্যা পুড়ি ছাই হয়া গেলো। ঘরের কিছুই রক্ষা করব্যার পারি নাই।” সুধীর রায় বলেন, “চার থেকে পাঁচজন মানুষ আসি পেট্রোল ঢালি মোর একটা ঘরোত আগুন নাগে দেয়। ওই আগুনোত মোর ছয়টা ঘরের সউগ পুড়ি যায়।”

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য দুলালী রানীর অভিযোগ, ‘বিকালে হঠাৎ অনেকে মিছিল নিয়ে এসে কোনও কারণ ছাড়াই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে গরু লুট করে নিয়ে গেছে। এমনভাবে তারা হামলা চালিয়েছে যে ঘরের মালপত্র সরানোর মতো সময় পাইনি আমরা। ঘরের আসবাবপত্রসহ হাড়ি-পাতিল সব পুড়ে গেছে। রাতে থাকার কোনও জায়গা নেই, রান্না করে খাওয়ারও কোনও উপায় নেই।’

গ্রামের এই বাসিন্দার মন্তব্য— ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দিয়ে যদি কেউ অপরাধ করে তার সাজা হোক। তাই বলে ঘরবাড়িতে হামলা করে আগুন ধরিয়ে মালামাল লুট করতে হবে, এটা কেমন আচরণ। আমরা এর বিচার চাই।’

 

পরে বিক্ষোভকারীরা রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে দখল করে অবস্থান নেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে তারা পুলিশের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। পুলিশ এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্ধশতাধিক টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও ৩০ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোঁড়ে। ওই সংঘর্ষের সময় হাবিবুর রহমান (২৬) ও সিএনজি চালক হামিদুল ইসলাম (৩০) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

এই হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া পাগলাপীর জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মাস্টার বলেন, দুপুরে পাগলাপীর এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশে কয়েকশ মানুষ ছিলেন। বিক্ষোভের পর তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পুলিশ সুপারকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিলো টিটুকে গ্রেপ্তারের জন্য। এরপরেও সে গ্রেপ্তার না হওয়ায় দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।

পুলিশসহ ৩০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে জাহাঙ্গীর হোসেন (২৫), মাহবুল ইসলাম (৩০), রিপন ইসলাম (২৫), আমিনুল ইসলাম (৩৫), শাহজাহান মিয়াসহ (৪৫) ছয়জনের নাম জানা গেছে। বাকিরা পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

নিহত হাবিবুর রহমান শলেয়াশাহ এলাকার একরামুল হকের ছেলে। আহতদের মধ্যে ছয়জনের ছররা গুলি এবং অন্যদের হাত ও পায়ে রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়েছে বলে ডা. শফিকুল জানান।

 

ওসি জিন্নাত বলেন, “পূর্বপরিকল্পিতভাবে হিন্দু বাড়িতে এ হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।” এ সম্পর্কে জানতে চাইলে রংপুর পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, তারা এ ঘটনা নিয়ে কয়েকদিন ধরে এলাকার লোকজনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা এ নিয়ে দায়েরকৃত মামলার আসামিকে গ্রেফতারের জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এমনকি আসামিকে গ্রেফতারের জন্য নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পুলিশ অভিযান চালিয়েও অভিযুক্ত টিটু চন্দ্র রায়কে পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের সাতজন সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে পুরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

 

 

 

Related posts:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *