বাংলাদেশ একটা শুয়োরের দেশ, ওদেশে কোন মানুষ থাকে না”কেন এই প্রশ্ন একজন মুক্তিযোদ্ধার?

বাংলাদেশ একটা শুয়োরের দেশ, ওদেশে কোন মানুষ থাকে না”কেন এই প্রশ্ন একজন মুক্তিযোদ্ধার?

 

 

কথাটা আমার নয়। কথাটা বলেছেন এই ভদ্রলোক। আপনাদের চিন্তার বিষয় হতে পারে,সোনার বাংলা আমার দেশ নিয়ে এমন একটি জঘন্য কমপ্লিমেন্ট দেওয়ার পরেও কেন আমি এই লোকের পা ধরে প্রনাম করেছি?

আর কেনইবা তার ছবি তুলে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি? আসুন জানা যাক সেই কারণটা।

লোকটা এসেছিলো আমার নতুন ফ্লাটের ইলেকট্রিকের কাজ করতে। প্রথম থেকেই লক্ষ করলাম লোকটা ফরিদপুর-গোপালগঞ্জ বেল্টের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছেন।

 

কোলকাতায় সচরাচর কেউ পুর্ববঙ্গীয় ভাষায় কথা বলে না। তিনি বলছেন। তিনিও হয়ত অনেক্ষন ধরে লক্ষ করছেন যে, বাকি কয়জন আমরা বাংলাদেশের সুনামে পঞ্চমুখ।
হঠাত তিনি প্রশ্ন করলেন- “কোই থেকে আসছ?”

আমি স্বগর্বে উত্তর দিলাম- বাংলাদেশ।

– শুয়োরের দেশ থেকে আইছ। এই জন্যই এতো কথা।

মাথায় হাজার ভোল্টের শক খেলাম। কি বলে এই বুড়ো? কিন্তু আমাকে মুখে কিছুই বলতে হল না। আমার অন্য ভারতীয় বন্ধুরাই প্রতিবাদ করে বসল। কিন্তু আমার মনে জাগ্রত হল এক গভীর আগ্রহ।

আমি প্রশ্ন করলাম, গিয়েছেন কখনওই বাংলাদেশে?

– ঘেন্নায় ওমুখো আর হইনি।

– ওমুখো আর হইনি মানে? কবে এসেছেন?

– মুজিবরে যে সালে তোমরা খুন করলে। ঐ সালেই।

আমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেলো। আমি বললাম ঘটনা কী বলেন তো? আসছেন কেন?

– ওদেশে কি মানুষ থাকে নাকি? শুয়োরের জাত সব।

সবাই আবার প্রতিবাদ করে উঠলো। চুপ করেন দাদা। কিসব বলেন?
লোকটা ততক্ষণে ঘেমে গেছে। রাগে থরথর করে কাঁপছে। আমি দেখতে পাচ্ছি লোকটার চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠছে। তিনি বলা শুরু করলেন…

 

“আমি একজন কমান্ডার। দেশ কেমনে স্বাধীন হইছে শুনবা? ত্রিপুরা গিয়া ৪৫ দিন ট্রেনিং নিছি। আমি ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। জেলায় জেলায়, থানায় থানায় গিয়া অপারেশন করছি।

এক জায়গা থেকে আরেক জাগা যাইতে ৭-৮ দিন লাইগা যাইত। এক মুঠ চিড়ে, এক মুঠ হুড়ুম (মুড়ি) খেয়ে থাকছি। হিন্দি বুঝতাম না। ইন্ডিয়ান আর্মি হিন্দিতে ট্রেনিং দিতো। কষ্ট হইত বুঝতে। তাও ট্রেনিং নিছি।

 

আমার বইনরে শুয়োরের বাচ্চা মুসলমানরা ধইরা নিয়া মেলেটারিগে হাতে দিছে। তারা বাঙ্কারে আটকায় রাইখা দিনের পর দিন ধর্ষণ করছে। আমার বোন একা না। আরো ৯০০ মেয়ে ছিলো।

 

প্রথম প্রথম ওরা কাপড় পরাই ছিলো। লজ্জায় অপমানে তখন ৪-৫ জন গলায় ফাঁসি নেয়। এর পর থেকে সবগুলারে ন্যাঙটা কইরা রাখত। কোন কাপড় নাই গায়ে। দুধ কাইটা নিছিলো কয়েকটা মেয়ের।

 

যখন ঐ বাঙ্কার থেকে মাইয়া গুলারে ছাড়াই আনছিলাম, এক একটা পেট নিয়া বাইর হইছিলো। জানো সে গল্প?

দেখো দেখো আমার হাতের দিকে দেখো, এখনো শরীরের লোম খাড়ায় যায়। আর তোমরা আমারে বাংলাদেশ চিনাও? আমার চেয়ে তোমার বাংলাদেশ দরদ বেশি? জন্মায়ছ কবে?”

 

ছবি: সেই অভিমানী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার

 

লোকটার গলা ধরে এসেছে। তিনি কিছুক্ষণ থামলেন। চোখ ভিজে উঠেছে। কাঁদোকাঁদো কাপা গলায় আবার শুরু করলেন।

 

 

“দেশ স্বাধীন হল। মুজিব দেশে আইসা বলল, অস্র জমা দিতে। এই হাতে ব্রাস চালাইছি, এল.এম.জি চালায়ছি। গুলি ফুটাইতে ফুটাইতে আনন্দ করতে করতে গিয়া বন্দুক জমা দিছি।

 

ইন্দ্রা গান্ধী না থাকলে দেশ স্বাধীন হইত? কি না করছে মহিলা। সবাইরে দিয়া আগে স্বীকৃতি দেওয়াছেন। এর পর তিনি দিছেন। যেদিন ইন্ডিয়ান আর্মি দেশে ঢুকল ৩ খান বড় বড় বিমান বোম্ব ফুটাইতে ফুটাইতে দেশে ঢুকছিল। দেশ স্বাধীন হবার পরে পানির মত রিলিফ দিছেন এই মহিলা। লুঙ্গী, শাড়ি, আটা, ময়দা, হরলিক্স।

 

৭২-৭৩ এর মঙ্গা। খাওয়ার কিছু নাই। ইন্ডিয়া থাইকা বস্তা বস্তা লবন যাইতো। লম্বা লাইন দিয়া দাঁড়ায় থাকতাম। এতোটুকু বাটিতে কইরা একটু লবন ভাগে পাইতাম। কম কষ্ট করছি??

তবুও দেশের প্রতি আশা ছিলো দেশের হাল ফিরব। দু:খ দূর হইব। দেশ ছাইড়া আসিনি তখনো।

 

তোমরা ৭৫ সালে মুজিবরে খুন করলা। তার কয়দিন পরেই আমার বাড়িতে এক রাজাকার ডাকাতি কইরা আগুন দিলো। বিকালে যেসব পোলাপান গুলারে দেখছি ফুটবল খেলে মাঠে, তারাই দেখি রাইতে আইছে ডাকাতি করতে।

 

আমরা জমিদার বংশের পোলা। তালুকদার বংশের পোলা। ঐ রাতে আমার আরেক বইনরে নিয়া গিয়া দাড়ি ওয়ালা দুই মুসলমান শুওর রেপ করল। কোন বিচার নাই।

 

এর পরের দিনই দেশের মুখে থু দিয়া চইলা আসছি। অনেক চেষ্টা করছি কোলকাতার ভাষা শিখতে; পারিনি। মুখ দিয়া বাঙ্গাল ভাষা বাইর হইয়া যাইত।

প্রথম দিকে লোকাল ট্রেনে বাদাম বেচছি। ৬-৭ জনের সংসার কি আর বাদাম বেইচে চলে?? ২ টাকা দিয়া আটা কিনা ধাপড়া বানায় খাইয়া থাকছি বহুদিন। বহু কষ্ট করছি জীবনে। তোমরা বহু কষ্ট দিছো। দেখো দেখো গায়ের লোম কেমনে দাঁড়ায় যায়।”

ততোক্ষণে আমার গলাটাও ধরে এসেছে। আমি পরম মমতায় তার হাতের লোম গুলোর উপরে আলতো হাত বুলিয়ে দিলাম।

“তোমরা আমারে বাংলাদেশ চেনাও?? আমার থেকে দেশের টান তোমাদের বেশি?? ঘেন্না লাগে। ঘেন্নায় আর ঐ মুখো যাই না। কোন মুসলিম শুয়োরের বাচ্চাকে আর বিশ্বাস করি না। কোন বাংলাদেশী শুয়োরের বাচ্চারে আর বিশ্বাস করি না।”

 

– আপনি কি একদিন এই কথা গুলো ক্যামেরার সামনে বলতে পারবেন?? এটা আমি আমার দেশের জনগণ আর সরকারকে শোনাতে চাই। যাবেন আপনি দেশে? ফিরে চলেন।

“আমার মুক্তিযুদ্ধ ট্রেনিং এর সার্টিফিকেট আছে। আরো কাগজপত্র আছে।”

– ফিরে চলুন। সরকার আপনাদের ভাতা দিচ্ছে। ফ্লাট দিচ্ছে।

“এই বাল দিয়া এখন কি করব? এই দেশে সুখেই আছি। কষ্টের দিন শেষ। সরকারী চাকুরী করি। মাসে সরকার দেয় ১২ হাজার টাকা। সপ্তায় ৩ দিন নাইট ডিউটি করি এক কোম্পানিতে। সেখানে পাই ১২ হাজার। আর এই টুকটাক খুচরো ইলেক্ট্রিকের কাজ তো আছেই। বেশ আছি।

সোনার দেশ ফেলায় আসছি। দেশ লাগবে না। রিফিউজি হয়েই জীবন কেটে গেছে। কিছু মনে নিও না। তোমাগো দেখলে রাগে জিদে মুখ দিয়া গালি আসে। নিজেরে কন্ট্রোল করতে পারি না।”

* সেই সন্ধ্যা থেকে মনে একটাই প্রশ্ন- “যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার পরেও কেন একজন মুক্তিযোদ্ধা দেশে থাকতে পারলেন না? দেশ স্বাধীন করার ৪ বছর পরেও কেন তাকে রিফিউজি হতে হল? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে??

আজকের প্রজন্ম কি বুঝবে কোনদিন যে, দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরে এসেও ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিলে এই বৃদ্ধরা কষ্ট পায়? আজকের প্রজন্ম কি বুঝবে যে যত সহজে তারা ‘স্বাধীনতা/বাংলাদেশ’ শব্দ উচ্চারণ করে, তা অর্জন করতে এই বৃদ্ধরা কি পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করেছে?

 

গলা ছেড়ে কিছুক্ষণ কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এতো তীব্রভাবে কখনওই আমার মন খারাপ হয় না। আমার শরীর জুড়ে আত্মগ্লানি!!

 

লেখক: আনন্দ কুটুম

কপি রাইট

eBiZCTG.

 

Related posts:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *