মিয়ানমার থেকে  বোরকা পরে পালিয়ে এসেছেন মুসলিম নারীদের সঙ্গে পূজা মল্লিক।

মিয়ানমার থেকে  বোরকা পরে পালিয়ে এসেছেন মুসলিম নারীদের সঙ্গে পূজা মল্লিক।

 

পূজা মল্লিক (২১)। স্বামী আশিষ কমুরা। তিন বছরের সন্তানের নাম রাজা। রাখাইন রাজ্যের মংডুর রেইক্যা পাড়ার ফকিরা বাজার এলাকায় বসবাস ছিল তাদের। সেখানে একটি স্যালুন চালাতেন আশিষ। স্বামী ও সন্তান নিয়ে ভালোই চলছিল পূজার সংসার। কিন্তু গত ২৭ আগস্ট সকালে হঠাৎ করে এলোমেলো হয়ে যায় সব।

গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে সবার, তারপর বাইরে বেরোতেই দাউদাউ আগুনের তাপ, ঘরবাড়ি পোড়ানো লেলিহান শিখা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়ির সব পুরুষকে বেঁধে ফেলে কালো পোষাকধারীরা। একে একে হত্যা করা হয় পূজার স্বামী আশিষ, শ্বশুর বলরাম, শাশুড়ি অনু বালা, দেবর খুশিস কুমার ও ননদ ঝুনু বালাকে। সবাইকে হত্যার পর পূজাকেও হত্যা করতে চেয়েছিল কালো পোশাক পরিহিত কয়েকজন ব্যক্তি। তবে ভাগ্যক্রম বেঁচে যান তিনি।

এরপর প্রতিবেশী মুসলিম নারীদের সঙ্গে বোরকা পড়ে বাংলাদেশে চলে আসেন পূজা। আশ্রয় হয়েছিল কুতুপালং ক্যাম্পে। মুসলিম পরিচয়ে সেখানেই সেখানেই ছিলেন এতোদিন। কিন্তু শনিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) কুতুপালং ক্যাম্পে থাকা এক নারীর কাছে পূজা মল্লিকের খবর পান হিন্দুদের জন্য নির্ধারিত ক্যাম্পের বাসিন্দারা। এরপর তাকে ও তার তিন বছরের শিশু রাজাকে নিয়ে আসা হয় পশ্চিম কুতুপালং হিন্দু ক্যাম্পে। যেখানে তার এক জীবিত ননদও আছেন। পরিবারের শুধু তারাই বেঁচে আছেন এখন। এমনটাই দাবি করেছেন পূজা মল্লিক। রবিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এসব কথা জানিয়েছেন প্রাণ নিয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা পূজা। সেদিনের সেই দুর্বিসহ ঘটনায় ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে আরও অনেক তথ্য জানান তিনি। ছেড়ে আসা মংডুর ওই পাড়াতে ১২টি হিন্দু পরিবারের বসবাস ছিল বলেও জানিয়েছেন পূজা।

সেদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে পূজা বলেন, ‘২৭ আগস্ট সকালে আমাদের গ্রামে হামলা করা হয়। হামলাকারীরা সবাই মুখোশ পড়া ছিল। তাই কাউকে চেনা যায়নি। আমাদের সামনেই পরিবারের সবাইকে গুলি করেও গলা কেটে হত্যা করে তারা। একবার আমি দেখেছি। এরপর আর দেখিনি। সহ্য করতে পারিনি। তারপর মুসলিম নারীদের সঙ্গে পালিয়ে আসি আমি।’

পরিবারের ব্যাপারে পূজা আরও বলেন, ‘১৮ বছর বয়সেই আশিষের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বাবা-মা ছাড়াও দুই ভাই ও দুই বোন ছিল আমার। ভাইদের নাম নির্মল ও বিমল। বোনদের নাম শিখা ও লালা। বাবা রাজ কুমার স্যালুন চালাতেন। মা সীতা রানী গৃহিনী। শুনছি বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ভাই-বোন বেঁচে আছে কিনা জানি না। তারা সবাই ছোট। আমিই পরিবারের বড় সন্তান। বিয়ের পরই আমার ছেলের জন্ম হয়। ওর বাবা নাম রেখেছে রাজা।’

আগে কখনও তাদের গ্রামে এ ধরনের হামলা হয়নি দাবি করে পূজা বলেন, ‘আমাদের গ্রামে কখনও এমন হামলা হয়নি। সকালে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। সবাইকে হত্যা করা হয়। আমার ননদ নিপূ বালা মামা বাড়িতে থাকার কারণে বেঁচে যায়। সেও সবার সঙ্গে পালিয়ে আসে। তবে আমি জানতাম না।’

মুসলিম নারীদের সাহায্যে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে যখন হামলা করা হয়, তখন আমি ছেলেকে নিয়ে অন্যান্য মুসলিম নারীদের সঙ্গে পালিয়ে আসি। তারা আমাকে একটা নেকাবওয়ালা বোরকা দেয়। সেটি পরে তাদের সঙ্গে হাঁটতে থাকি, সিঁদুর-শাখা খুলে ফেলি। দুই দিন হেঁটে বাংলাদেশ সীমান্তে আসি। এরপর কুতুপালং। তখন কেউ জানতো না আমি হিন্দু না মুসলিম। শুধু হটিনা নামে এক নারী জানতো। এখানে আসার পর তাদের সঙ্গে কুতুপালং যাই। ক্যাম্পে ২০ দিন ছিলাম। এক সময় সবাই আস্তে আস্তে জেনে যায় আমি হিন্দু। এরপর হিন্দু ক্যাম্প থেকে লোকজন গিয়ে আমাকে হিন্দু ক্যাম্পে নিয়ে আসে। আমি শনিবার থেকে এখানেই (হিন্দু ক্যাম্পে) আছি।’

পূজার ননদ নিপূ বালা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মা, বাবা তিন ভাই ও এক বোনকে হত্যা করা হয়েছে বলে খবর পাই। এরপর আমরা মামা মৃদুলের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে আসি। বাড়িতে থাকলে আমাকেও মেরে ফেলতো।’

আরসা (আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) বা আলকিন কখনও দেখছেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে তাদের কখনও দেখিনি। তারা কী করে তাও জানি না।’ তবে বাংলাদেশে এসে ভয় কেটে গেছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এখন স্বস্তি লাগছে। তবে বার বার বাবা-মা ভাইবোনের কথা মনে পরছে।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু পরিবারগুলোকে পশ্চিম কুতুপালং ক্যাম্পে আগে থেকে অবস্থান করা ১৬টি হিন্দু পরিবার নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। একটি পরিত্যক্ত মুরগীর খামারেও থাকছে কয়েকটি পরিবার। সেখানেই রান্না করে খাওয়ানো হচ্ছে তাদের। এছাড়া ত্রাণও দেওয়া হচ্ছে। হিন্দু পরিবারগুলোকে দেখাশোনার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটির প্রধান সুজন শর্মা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে মোট মোট একশ’ ৬২ পরিবারের পাঁচশ’ ১৮ জন এসেছেন। এদের মধ্যে নারী একশ’ ৩৩ জন। তাদের মধ্যে দশ জন সন্তানসম্ভবা। সোমবার একজনের সন্তান প্রসবের কথা রয়েছে। সাত জন বিধবা। এক থেকে ১০ বছরের মেয়ে শিশু ৬৫ জন ও ছেলে শিশু ৯৫ জন। পুরুষ একশ’ ২৮ জন। বৃদ্ধ ৮ জন।’

রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবা ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে থাকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মুক্তি’। এ প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর্মী সুমা শর্মা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব হিন্দু মায়েদের সন্তান হবে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত পরীক্ষা করছি। এছাড়াও শিশুদের বাড়তি যত্ন নেওয়া হচ্ছে।’

কুতুপালং এলাকায় ২৭টি হিন্দু পরিবার আছে। তারাই মূলত এই ক্যাম্পের লোকদের দেখাশোনা করছেন। ক্যাম্পের পাশেই রান্নার জন্য একটি ঘর করা হয়েছে। সবাই এই ক্যাম্পেই অবস্থান করছেন।

 

Related posts:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *