রাজ্য সরকারের প্রচারে সবসময়ই হাসছে পাহাড়, সারা রাজ্যে মানষ,  এত রক্তপাত, এত মৃত্যু৷ অখন্ড বাংলায় এর দায়  কার? 

রাজ্য সরকারের প্রচারে সবসময়ই হাসছে পাহাড়, সারা রাজ্যে মানষ,এত রক্তপাত, এত মৃত্যু৷অখন্ড বাংলায় এর দায়  কার? 

 

কলকাতা: পাহাড় হাসছে৷ রাজ্য সরকারের প্রচারে সবসময়ই হাসছে পাহাড়৷ হাসতে হাসতেই এত রক্তপাত, এত মৃত্যু৷ এত মৃতদেহের বোঝা কে বইবে? পাহাড়ে রক্তের হোলি খেলার দায় বিমল গুরুংয়ের পাশাপাশি কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

 

জানা গিয়েছে, বছর ২৭ এর পুলিশ অফিসার মধ্যমগ্রামের অমিতাভ মালিক বিয়ে করেছিল মাত্র ৬ মাস আগে৷ প্রেমের সংসার সবে গড়ে উঠছিল৷ আর শুক্রবার, সাদা কাপড়ে ঢাকা স্বামীর মৃতদেহের উপর রূপার কান্না কাঁদিয়েছে গোটা রাজ্যকেই৷ অমিতাভ-রূপার নতুন জীবনের স্বপ্ন ভেঙে খানখান৷ কালাশনিকভের একটা গুলি ফুঁড়ে দিয়েছে টগবগে তরুণের হৃদপিন্ড৷ সেই দার্জিলিং থেকেই ফিরছে অমিতাভের নিথর দেহ৷ দায় কার ? সবটাই কি বিমল গুরুংয়ের?

একটা সংসার ভেঙে চৌচির৷ কত স্বপ্ন শুরুর আগেই শেষ৷ মৃত্যু মৃত্যুই৷ মোর্চা সমর্থকরাও মারা যাচ্ছেন৷ দায় কার? নিজের পায়ের তলায় জমি বাঁচাতে পাহাড়ে অশান্তির খেলা খেলতে থাকা বিমল গুরুং কি একাই দায়ী? না কি, সব কিছু জোর করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দখল করার মানসিকতা নিয়ে মেতে থাকা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সমান ভাবে দায়ী? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

পাহাড়বাসীর পাশাপাশি এই প্রশ্ন তুলছে গোটা রাজ্যও৷ অনুচ্চারিত প্রশ্ন উঠছে পুলিশ মহলেও৷ আর তাই নবান্নে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে ও নিজের পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশ্যে বার্তা রাখতে হয় এডিজি আইনশৃঙ্খলা অনুজ শর্মাকে৷ মোর্চার সঙ্গে মাওবাদী ও উত্তর-পূর্বের জঙ্গিদের যোগাযোগের কথা বলেছেন তিনি৷ প্রশ্ন এখানেও৷ মাওবাদী ও উত্তর-পূর্বের জঙ্গিদের সাহায্যে যারা যুদ্ধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়তে থানার সাব ইন্সপেক্টররা কি যথেষ্ট প্রশিক্ষিত? তাও আবার মোর্চার হাতের তালুর মত চেনা পাহাড়ে? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

একজন পুলিশ কর্মীর পাশাপাশি একজন মোর্চা সমর্থকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷ বেসরকারি সূত্রে খবর, শুক্রবার পুলিশের গুলিতে ফের ১ জন মোর্চা সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে৷ এই ২ জন রাজ্যবাসীর মৃত্যুর দায়িত্বই বা কে নেবে? দায় কার?

এর আগেও পাহাড়ে ২ জন মোর্চা সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে৷ অভিযোগ, সেটাও হয়েছিল পুলিশের গুলিতেই৷ তবে, নবান্নে ও উত্তরকন্যাতে দুটি সর্বদলীয় বৈঠকের পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছিল৷ পাহাড়ে বনধ উঠেছিল৷ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল দার্জিলিং৷ কিন্তু বিমল গুরুং যেই পাহাড়ে ফেরার ঘোষণা করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরার প্রক্তিয়া শুরু হয়ে গেল৷ তার ফলশ্রুতিই হল, আবার এই মর্মান্তিক মৃত্যু৷

গত জুন থেকেই পাহাড় আর হাসছে না৷ পাহাড় আবার জ্বলছে৷ পাহাড় আবার কাঁদছে৷ মোর্চা পুলিশ সংঘর্ষে রণক্ষেত্র দার্জিলিং৷ আতঙ্কে পাহাড়বাসি৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাহাড় দখলের লড়াইকেই বিরোধীরা পাহাড় জ্বলার জন্য ফের দায়ী করেছেন৷ রাজ্যের বিরোধী দলগুলি ও মোর্চা, সরকারের উন্নয়ন সহ্য করতে পারছে না বলেই অশান্তি করছে পাহাড়ে, পাল্টা দাবী শাসক দলের৷

দার্জিলিং থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চট করে আর একবার দেখে নেওয়া যাক কয়েক মাস আগে হয়ে যাওয়া পাহাড়ে ৪ পুরসভা ভোটের ফলাফল৷
* মিরিক পুরসভা: মিরিক পুরসভা দখল তৃণমূলের৷ মোর্চার হাত থেকে মিরিক পুরসভা ছিনিয়ে নেয় তৃণমূল৷ ৯ আসনের মধ্যে তৃণমূলের দখলে ৬টি, মোর্চা পেয়েছে ৩টি আসন৷ পাহাড়ে এই প্রথম একটি পুরসভা দখল করেছে সমতলের কোন রাজনৈতিক দল৷
* দার্জিলিং পুরসভা: দার্জিলিং দখলে রেখেছে মোর্চা৷ গোর্খার দাপট অব্যাহত দার্জিলিং এ৷ মোট ৩২টি আসনের মধ্যে ৩১টি আসনে জয়ী মোর্চা৷ তবে, প্রথম খাতা খুলতে পেরেছে তৃণমূল৷ তাদের দখলেও এখন একটি আসন৷
* কার্শিয়াং পুরসভা: কার্শিয়াং দখলেই রেখেছে মোর্চা৷ ২০টি আসনের মধ্যে ১৭টি আসনে জয়ী মোর্চা৷ তৃণমূল ৩টিতে জয়ী৷
* কালিম্পং পুরসভা: কালিম্পং পুরসভাও দখলে রেখেছে মোর্চা৷ মোট ২৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৯টিতে জয়ী মোর্চা৷ ২টিতে তৃণমূল৷ নির্দল দুটি আসন পেয়েছে৷

বোঝাই গিয়েছিল, মমতার বারবার আসা সত্বেও পাহাড়ে মিরিক ছাড়া আর কোন পুরসভায় তেমন কোন দাগ কাটতে পারে নি তৃণমূল কংগ্রেস৷ সর্বত্রই বিমল গুরুংয়ের মোর্চার জয়-জয়কার৷ আবার অন্যদিকে দেখতে গেলে, সমতলের কোন দলের পাহাড়ে এত ভালো ফল করাও কোনদিন সম্ভব হয় নি৷ যেটা করে দেখিয়েছেন মমতা৷ তাই পাহাড় পুরোপুরি দখল করতে যে এবার মমতা তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন সেটা বোঝাই যাচ্ছিল৷ তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে পুরভোট শেষ হবার পরই পাহাড় দখল করতে এভাবে ঝাঁপিয়ে পরবেন তা অনেকের মতো মোর্চার নেতারাও ভাবতে পারেন নি৷

 

জুন মাসে বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক ভাবে মেনে না নেওয়া নিয়ে আন্দোলন শুরু করে মোর্চা৷ অন্যদিকে, মোর্চার আন্দোলনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি উপেক্ষা করে জেদ করে জুন মাসে চার দিনের পাহাড় সফরে যান রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান৷ সেই শুরু, জেদ আর পাল্টা জেদের বলিতে আজও ভুগছে দার্জিলিং ও রাজ্য৷

মমতার জেদ বজায় রেখেই গত ৮ই জুন রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক হয় দার্জিলিং রাজভবনে৷ বৈঠক শুরুর আগে থেকেই ম্যাল লাগোয়া অংশে অবস্থান বিক্ষোভে বসেছিল মোর্চা৷ মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের দেখানো হয় কালো পতাকা৷ শহরজুড়ে হয় রাজ্য সরকার বিরোধী মিছিল৷ বিমল গুরুং জানিয়েছিলেন, পাহাড়ে বাংলা ভাষাকে ঐচ্ছিকও করা যাবে না৷ আর তা দার্জিলিং এর ক্যাবিনেট বৈঠকেই অনুমোদন করাতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ তা না হলে লাগাতার

আন্দোলন শুরু হবে৷ বোঝাই যাচ্ছিল, বিনা যুদ্ধে মমতাকে একচুল জায়গা ছাড়বে না মোর্চা৷ যদিও গুরুং বাহিনীর এহেন ঘোষণাকে অবশ্য পাত্তাই দেন নি মমতা৷ কেননা, ৪৫ বছর পর দার্জিলিং রাজভবনে বৈঠক হয়েছিল রাজ্য মন্ত্রিসভার৷ যা নিয়ে সাজ সাজ রব ছিল পাহাড় জুড়ে৷ ৩০ জনেরও বেশি মন্ত্রী ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে৷ কিন্তু সেই বৈঠক চলাকালীন যে দার্জিলিং এ সেনা নামাতে হবে, সেটা ছিল একেবারেই অকল্পনীয়৷

সেই শুরু৷ মন্ত্রিসভার বৈঠককে কেন্দ্র করে তুমুল বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার কর্মী-সমর্থকরা৷ মন্ত্রীসভা বৈঠক শেষ হবার পরই বিক্ষোভ রণক্ষেত্রের আকার নেয়৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায় পুলিশ৷ মোর্চা সমর্থকদের উপর ব্যাপক লাঠিচার্জ করা হয়৷ এদিকে পুলিশকে লক্ষ্য করে মোর্চা সমর্থকেরা পাথর ছোড়ে, যার আঘাতে একাধিক পুলিশকর্মী আহত হয়৷ একাধিক পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় মোর্চা সমর্থকেরা৷ বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত দোকান৷ শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে নামে সেনা৷ পাহাড়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বনধের ডাক দিয়েছিল মোর্চা৷

সেই শুরু৷ তারপর থেকেই অনির্দিষ্টকালের বনধ দেখেছে পাহাড়৷ চোরাগোপ্তা হামলা ও মৃত্যুর মিছিলও দেখেছে পাহাড় তথা রাজ্য৷ মোর্চা সমর্থকদের রক্তে লাল হয়েছে পাহাড়৷ পাহাড় থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় পাহাড়ের স্বঘোষিত রাজা বিমল গুরুং৷ মমতার হাত ধরেই উঠে আসে বিনয় তামাং৷ বিমল গুরুংয়ের পাল্টা হিসাবে বিনয় তামাং কে ব্যবহার করতে চেয়েছেন মমতা৷ যা অশান্তি আরও বাড়িয়েছে৷

তবু, পরিস্থিতি পাল্টেছিল৷ বিমল গুরুংয়ের ক্ষমতা খর্ব করতে বিনয় তামাংয়ের নেতৃত্বে GTA চালানোর প্রচেষ্টা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ বিরোধীদের সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন৷ অভিযোগ ছিল, এই ভাবে মোর্চার মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে কি পাহাড় দখল করতে পারবেন মমতা? বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও অন্যান্য বিজেপি কর্মী সমর্থকদের দার্জিলিং এ বিনয় তামাং বাহিনীর হাতে মারধর খাবার পরিকল্পনাও মমতার তৈরি করে দেওয়া বলে অভিযোগ বিরোধীদের৷

তবু, মোটের উপর শান্ত ছিল পাহাড়৷ ধীরে ধীরে স্বাভাবিকও হচ্ছিল পাহাড়৷ কিন্তু বিমল গুরুং কে আর পাহাড়ে ক্ষমতা দখল করতে দিতে রাজী নন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিযোগ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার৷ বিভিন্ন মামলায় তাকে ফাঁসিয়ে গারদ-বন্দী করতেই পাহাড়ে নির্দেশ মমতার৷ আর তাই, যেই বিমল গুরুং ঘোষণা করলেন তিনি দার্জিলিং ফিরছেন, ব্যাস শুরু হয়ে গেল পুলিশের অভিযান৷ মমতা জানতেন, অস্তিত্ব বাঁচাতে গুরুং প্রত্যাঘাত করবেনই৷ ঠিক তাই হল৷ তাতেই প্রাণ হারালেন এক পুলিশ কর্মী সহ আরও কয়েকজন রাজ্যবাসী৷

হাস্যমুখ পাহাড় কাঁদছে কেন? ভয়ংকর সুন্দরী জ্বলছে কেন? উন্নয়নের মোড়কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাহাড় দখলের রাজনীতিই কি দায়ী? না কি পুরভোটের রেজাল্টে ভয় পেয়ে, রাজ্য সরকারের উন্নয়নকে বাধা দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মোর্চার জেদই এর জন্য দায়ী? প্রশ্ন আগেই ছিল৷

পাহাড়ে সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য বিমল গুরুংয়ের বিচার হবে৷ নিজের অনুগামীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেবার জন্য গুরুংয়ের বিচার হবে আইন অনুযায়ী৷ রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার দায়ে দোষী সে৷ মানুষের ভোটে নির্বাচিত রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দায়ে তার বিচার হবে আদালতে৷  তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়৷ লাশের রাজনীতির দায় কার? পুরোটাই কি বিমল গুরুংয়ের? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

পাহাড়বাসীর পাশাপাশি এবার প্রশ্ন তোলা শুরু করলেন সমতলবাসীরাও৷ সেখানে কিন্তু বিমল গুরুংয়ের পাশাপাশি আঙুল উঠছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেদের রাজনীতির দিকেও৷ গোর্খাল্যান্ড বনাম অখন্ড বাংলার এই রাজনীতিতে যারা বলি হচ্ছেন তাদের দায় কে নেবে? এত মৃত্যুর দায় কার ?

 

 

Related posts:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *