হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান গ্রন্থাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয়! 

হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান গ্রন্থাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয়! 

 

প্রশ্নঃ হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান গ্রন্থাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদান কর।

ভূমিকা:

 

 

 

 পৃথিবীর অসংখ্য ধর্মের মধ্যে হিন্দু একটি প্রাচীনতম ধর্ম। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল আর্য ধর্ম। কারণ ইরান থেকে আগত সেমেটিক শাখার আর্য গোত্ররা এ ধর্মের বাহক ছিল। এরা আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় পাঁচ হাজার অব্দে উপমহাদেশে আগমন করে আদি অধিবাসী তথাকথিক অনার্যদেরকে বিতারিড়ত করতঃ সপ্তসিন্ধু বিধৌত পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এ জন্য কালক্রমে তাদেরই উচ্চারণে সিন্ধু শব্দের অপভ্রংশ হিন্দু জতি নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে। অতঃপর প্রাচীন আর্য ধর্ম তখন থেকে হিন্দু ধর্ম নামেও পরিচিতি লাভ করে। এ ধর্মের আলোচনাই আমাদের এ পাঠের প্রদিপাদ্য বিষয়। 

হিন্দু ধর্মের পরিচয়:

 হিন্দু ধর্ম মূলত আর্যদের বৈদিক ধর্ম। এ ধর্মের আদি ধর্মগ্রন্থের নাম ঋক বেদ। এ বেদের সূচনাতে একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম ছিল। এটা অবতারবাদের প্রবক্তা। অতঃপর যুগে যুগে ব্রহ্মের অবতারগণ আগমন করতঃ ঋক বেদের অনুশীলন করতে গিয়ে এর সাথে স্থান-কাল উপযোগী সংযোজন-সংবর্ধন করে আরো ৪টি সংস্করণ তৈরি করে। এগুলোই হিন্দু ধর্মের অনুসরণীয় পঞ্চবেদ। এ পঞ্চবেদে বিশ্বাস করাকেই হিন্দু ধর্ম বলে; যাকে পূর্বকালে আর্য ধর্ম বলা হত।

হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থ ও শিক্ষা:

প্রত্যেক ধর্মের আচার-আচরণ ও বিধিমালা সম্বলিত নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ থাকে। তেমনি হিন্দু ধর্মেরও ধর্মগ্রন্থ আছে। তবে হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থের সংখ্যা অনেক। এ ধর্মগ্রন্থগুলো হল ১. বেদ, ২. উপবেদ, ৩. বেদান্ত, ৪. স্মৃতি সংহিতা, ৫. গীতা, ৬. পুরাণ, ৭. আগামশাস্ত্র, ৮. রামায়ণ ও মহাভারত, ৯. চন্ডী এবং ১০. ষড়দর্শন, উপনিষদ ইত্যাদি। উক্ত ধর্মগ্রন্থসমূহ ও এগুলোর সময়কাল সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল।

১. বেদ: হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে বেদের স্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃত ‘বিদ’ ধাতু থেকে বেদ শব্দটি নিস্পন্ন। বিদ+ঘঙ বেদ। বেদ অর্থ জানা (To Know)। বৈদিক যুগে ঋষিগণ বেদকে ভিত্তি করে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। যারা এই বেদকে আবিষ্কার করেছেন তাদের ঋষি বলা হয়।জনায়েক মহাপ্রাজ্ঞা হলেন বেদের মূল আবিষ্কারক আর ঋষিগণ আবিষ্কার করেছেন বেদের অন্তর্নিহিত আধাত্মিকতা।এই গ্রন্থে প্রকৃতির পূজার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বেদের সংখ্যা চারটি। যথা- ১. ঋকবেদ, ২. সামবেদ, ৩. যজুবেদ ও ৪. অথর্ববেদ।বেদব্যাশ তা সংগ্রহ করেন এবং গণেশ তা লিপিবদ্ব করেন। শুধুমাত্র ঋকবেদে চাঁদ,সূর্য,পৃথিবী,আকাশ, অবনি,বারি,প্রভাত,সন্ধ্যা মলয়,ঝড়, নদ-নদী,জলপ্রপাত।পাহাড়-পর্বত ইত্যাদির ন্যায় ছিয়াত্তুরটি প্রাকৃতিক অস্তিত্ব পূজার কথা বলা হয়েছে।এই বেদের সন্ধান পাওয়া সকল ঋষিগণের নাম জানা যায় নাই।মনু,বিশ্বমিত্র,বিশ্বধারা ও লোপা মুদ্রায় ন্যায় চার পুরুষ ও দুই মহিলা ঋষির কথা উল্লেখ রয়েছে।এই চারটি গ্রন্থের পরিচিতি নিম্নে পেশ করা হলঃ

১. ঋগ্বেদঃ এটি প্রথম বেদ।এটা সংহিতা,ব্রাহ্মণ অরন্যক ও সূত্রভেদে চার প্রকার। ঋক সংহিতাই ঋগ্বেদের আদি গ্রন্থ।এটা সকল বেদ ও পৃথিবীর সকল শাস্ত্র অপেক্ষা প্রাচীন। কারো মতে যে সময় আর্য সভ্যতা চারিদিকে বিস্তৃত হতে শুরু করে,সে সময় আর্যগণ আগ্নিপূজা প্রচার করার জন্য চারিদিকে পর্যটন করতে আরম্ভ করেন তখন থেকেই বেদের সংহিতা ভাগ সংগ্রহ করে।এখানে সর্বমোট ১০৫৫২টি মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞে দেবতাদের আহবান করা হয়েছে।

২. সামবেদঃ সামবেদ ব্রহ্মার উত্তর মুখ থেকে নিঃসৃত। এটি ২য় বেদ।মহর্ষী হৈসিনিকে সামবেদ শ্রবণ করাতে নিযুক্ত করিয়েছেন।বেদমন্ত্র,গান-বাজনা,সাধনা,সান্ত্বনা,প্রিয় বচন ইত্যাদি সামবেদ। সামবেদের বাক্যসমূহ সুরের মাধ্যমে করা হয়েছে। সামবেদ ঋগ্বেদের একটি অংশ।ঋদ্বেগ থেকে সাম ও যজুর্বেদের বিষয়বস্তু গ্রহণ করা হয়েছে।এই বেদের মন্ত্রসংখ্যা হল ১৮৭৫টি।৭৫টি মন্ত্র সামবেদের নিজস্ব আর বাকিগুলো ঋকবেদ থেকে নেওয়া হয়েছে।এটি মূলত প্রার্থনাসঙ্গীতের একটি গ্রন্থ।এটি দুইভাগে বিভক্ত একটি হল আর্চিক আরেকটি হল গান।যে ভাগে কেবল সঙ্গীতের সংকলন আছে তা হল আর্চিক আর যে খণ্ডে কেবল সঙ্গীতের স্বরলিপি আছে তা হল গান। গান বা সঙ্গীতের মাধ্যমে দেবতার প্রশংসা করা হয়েছে।

৩.যজুর্বেদঃ এই বেদশাস্ত্র শিত শাখাযুক্ত। এতে যজ্ঞানুসারে মন্ত্রসমূহ ও নিয়ম পালনের বিষয় রয়েছে। এই বে দুই ভাগে বিভক্ত। তা হল কৃষ্ণ যজু ও শুক্লা যজু।এই যুগে যাকে গদ্য বলা হয় তাই হল যজু।এখানে পূজা-অর্চনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে মন্ত্র সংখ্যা মোট ১৯৭৫টি।এ খণ্ডে মন্ত্র দ্বারা হোম সামগ্রী ব্যবহার করে দেবতাদের আহুতি করা হত। ৪. অর্থব বেদঃ অর্থববেদ ব্রহ্মার উত্তর মুখ থেকে নিঃস্কৃত।বিষ্ণু পুরাণে দেখা যায় প্রথমে বেদ ছিল একটিমাত্র।পরে তা ব্রহ্মার আদেশে ব্যাসদেব চার ভাগে বিভক্ত করেন। অর্থববেদের আভিধানিক অর্থ বার্ধক্যজনিত অসমর্থ,নড়িতে চড়িতে অসমর্থ,জরাগ্রস্থ,স্থবিরতা। এ সংকলনে পার্থিব-অপার্থিব বা পরকালের বিদ্যা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।এখানে বিজ্ঞান ও মহাজাগতিক বিষয়াবলী নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।এই গ্রন্থে পূর্বের তিনটি গ্রন্থ থেকে মন্ত্র নেওয়া হয়েছে। এখানে মন্ত্রের সংখ্যা সর্বমোট ৫৫৭৭টি।এখানে ধর্ম,অর্থ,কাম,মোক্ষ জগৎ সংসার কোন কিছুকেই অস্বীকার করা হয় নাই।এখানে রোগ-ব্যাধির কথা তুলে ধরা হয়েছে।এজন্যে এই অর্থব বেদকে আয়ুর্বেদের গ্রন্থ বলা হয়।

বেদের শিক্ষা: পৃথিবীতে যে সমস্ত ধর্মগ্রন্থ রয়েছে তার প্রত্যেকটিরই স্ব স্ব শিক্ষা রয়েছে।হিন্দু ধর্মের বেদগ্রন্থের শিক্ষা একমাত্র কর্ম।যেহেতু কর্মই মানুষের একমাত্র ধর্ম এবং ধর্মের মাধ্যমেই মানুষ তার নিজের কর্তব্য অনুধাবন করতে পারে। এ জন্য হিন্দু ধর্মে বলা হয়, মানুষ কর্মের মাধ্যমেই ঈশ্বর, স্বর্গ ও যাবতীয় কল্যাণ পেতে পারে এবং মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতে পারে।

২. উপবেদ: মূল বেদ ছাড়াও চারটি উপবেদ আছে। যথা- ১. আয়ুর্বেদ, ২. ধনুর্বেদ, ৩. গন্ধর্বেদ এবং ৪. স্থাপত্যর্বেদ। আয়ুর্বেদ হল ভেষজ শাস্ত্র, ধনুর্বেদ হল অস্ত্রবিদ্যা, গন্ধর্বেদ হল সঙ্গীত বিদ্যা আর স্থাপত্যর্বেদ হল কৃষিবিদ্যা। মানবকল্যাণের কথা চিন্তা করে এই বেদ ঋষিগণ রচনা করে থাকেন। উপবেদের শিক্ষা: উপবেদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরকে চিকিৎসা, সঙ্গীত, স্থাপত্য ও অস্ত্রবিদ্যার শিক্ষা দিয়ে থাকে।

৩. বেদান্ত: বেদান্ত বলতে বেদের শেষকে বুঝানো হয়। বেদের মূল ভাবকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য বেদের সাহায্যকারী ছয়খানা অবয়বগ্রন্থ অধ্যয়ন করা আবশ্যক। আর এই অবয়বগুলোকে বলা হয় বেদান্ত। এগুলো হল- ১. শিক্ষা, ২. কল্প, ৩. ব্যাকরণ, ৪. নিরুক্ত, ৫. ছন্দ এবং ৬. জ্যোতিষ।  বেদান্তের শিক্ষা: বেদান্ত যদিও বেদের ছয়খানা অবয়ব গ্রন্থ আর শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ এবং জ্যোতিষ এর মূল বিষয় তথাপি এর নিজস্ব একটা শিক্ষা রয়েছে। আর সেটা হল মানুষকে কর্মের চেয়ে শিক্ষার প্রতি অনুগামী করে তোলে। যাতে করে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি পেয়ে স্রষ্টাকে বেশি উপলব্ধি করতে পারে।এই সকল শিক্ষার মূল ভিত্তিসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

১.শিক্ষাঃ শিক্ষার মাধ্যমে বর্ণের বিশুদ্ব উচ্চারন জানা যায়। স্বরবিজ্ঞান যার দ্বারা বৈদিক যুক্তিগুলি উচ্চারণ করে গান করার পদ্বতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

২. ছন্দঃ ছন্দ জ্ঞানের অভাবে বেদের শিক্ষা অপূর্ণ থাকে। রস,গুণ,দোষ উপলব্দ্বি হয় না এবং উচ্চারিত শব্দ হৃদায়গম হয় না।

৩. ব্যাকরণঃ ব্যাকরণ হল বুৎপত্তিগতশাস্ত্র।বৈদিক সাহিত্যে পরিচয়ের সহায়ক।

৪. নিরুক্তঃ নিরুক্ত বৈদিক শাস্ত্রের যোগার্থ নিরুপিত হয়েছে। বৈদিক শব্দ ও বাক্যসমূহের অর্থ প্রতিপাদক গ্রন্থ।

৫. জ্যোতিষঃ এখানে জ্যোতিষে গ্রহ-নক্ষত্রাদির স্থান ও গতি আলোচিত হয়েছে। এর দ্বারা সূর্যাদি,গ্রহের অবস্থান গতি ও স্থিতি বিষয়ক জ্ঞান লাভ হয়।  ৬. কল্পঃ এটি সূত্রগ্রন্থ। বেদের ব্রাহ্মণ ভাহ থেকে সারতত্ত্ব সূত্রাকারে গ্রথিত।বাক্য প্রয়োগ যাতে কল্পিত অর্থাৎ সমার্পিত হয়।

৪. স্মৃতি সংহিতা: এটি হল হিন্দু ধর্মের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।মূলত হিন্দু ধর্মের অনুসারীগণের ধর্ম-কর্ম কি হবে তা এই স্মৃতিতে বর্ণনা করা হয়েছে। যা যা স্মৃত হয়েছে তাই স্মৃতি। স্মৃতি পদের অর্থ স্মরণ।পরবর্তীতে আর্য যুনি ঋষিরা বেদের শাশ্বত সত্যের কথা অন্তরে স্মরণ রেখে তার ভিত্তিতে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ঢোলে বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশের গতি অনুসারে নিজেদের সময়োপযোগী কতগুলি শাশ্ত্র রচনা করেন। কুড়িখানা স্মৃতি সংহিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ১. মনুস্মৃতি, ২. যজ্ঞবলক, ৩. পরাশ্বর স্মৃতি ইত্যাদি। এই স্মৃতিশাস্ত্র শুধুমাত্র ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনকে ঘিরেই নয় বরং, তা রাজরাজড়দের প্রতি উপদেশ, আইনসমূহের রুপরেখা,নীতি ও নৈতিকতা,চিকিৎসা বিজ্ঞান,সমর বিজ্ঞান,শিল্প বিজ্ঞান ও সঙ্গীতবিদ্যা অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।স্মৃতি সংহিতার শিক্ষা: আর্য জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্য ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে সি স্মৃতিতে।দশবিধি সংস্কার,খাদ্যখাদ্য বিচার, ব্রত, পূজা,প্রায়ঃশ্চিত্য,রাজধর্ম,শাসননীতি ইত্যাদি ছাড়াও এতে সমাজতত্ত্ব ও গার্থস্থ্য বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

৫. গীতা: গীতা হিন্দু সমাজে সর্বাধিক ধর্মগ্রন্থ হিসাবে বিশেষ পরিচিত। যেহেতু মহাভারতের ভিক্ষুপূর্বের প্রসিদ্ধ শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা, তাই চতুস্তর বেদের সার উপনিষদ আর উপনিষদের সার গীতা। গীতা মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত ১৮টি অধ্যায়। এর বক্তা শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রোতা অর্জুন।এর অপর নাম হল সপ্তশাতী।কারণ এতে সাত শত শ্লোক আছে।গীতা একাধারে ধর্ম,দর্শন ও কাব্যগ্রন্থ। এতে বেদ,বেদান্ত,উপনিষদ প্রভৃতি বিষয়ে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গীতাকে হিন্দুধর্মে সকল আনুষ্ঠানিকতার ধর্মপুস্তক বলে গণ্য করা হয় এবং এর থেকে পাঠ উপস্থাপন করা হয়।

গীতার শিক্ষা: হিন্দু ধর্মের প্রতিটি গ্রন্থ বা শাস্ত্রে পৃথক পৃথক শিক্ষা রয়েছে। গীতার ঈশ্বর পরম তত্ত্ব, পরমাত্মা, পুরুষোত্তম ঈশ্বর সর্বভূতের সনাতন বীজ। তাই ঈশ্বর সত্তাতে সকলের সত্তা এবং তিনি নিস্তব হয়েও স্বগুণ। তাছাড়া গীতা আরো শিক্ষা প্রদান করে, ঈশ্বর লাভ করতে হলে যোগ, কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান -এ চারটি মার্গের অনুসরণ করা আবশ্যক। এখানে ধর্মতত্ত্ব,জ্ঞানতত্ত্ব,সমাজতত্ত্ব,রাজনীতি,গার্হস্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

৬. পুরাণ: এটি হিন্দু ধর্মের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ। যা পুরাতন তাই পুরাণ।দার্শনিক তত্ত্ব ও সাধনাতত্ত্ব নানাবিধ উপাত্থ্যানের মাধ্যমে পুরাণ প্রচার করেছে। এ কারণেই তার নাম পুরাণ। একটি সময় যখন বেদ গ্রন্থ পাঠ করা জনসাধারণের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাড়ায় তখন খৃষ্টীয়পূর্ব ৫ম থে ৭ম শতক পর্যন্ত পুরাণ গ্রন্থটি সংকলিত হয়। পুরাণের লক্ষণ পাঁচটি। যথা- স্বর্গ, প্রতিস্বর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত। আবার পুরাণকে দু’শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। যথা- ক. মহাপুরাণ, খ. উপপুরাণ। উভয়ের সংখ্যা ১৮।এর মধ্যে বিষ্ণুপুরাণ,পক্ষপুরাণ,বায়ুপুরাণ,অগ্নিপুরাণ ও ভাবগত পূরান অন্যতম।এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে পূজা-পার্বন ও ব্রতকেন্দ্রিক করা হয়।পূরানে দেবদেবীদের মানবায়ন ও জীবের আকৃতি দেওয়া হয়। পুরাণেই হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতা প্রকাশ পায়। এখানে অগ্নি,গণেশ,বরুন,দূর্গা,চন্ডী ইত্যাদি পৌরাণিক দেবতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

পুরাণের শিক্ষা: পুরাণগ্রন্থের মধ্যে গল্পকথা, রূপক, উপমা ও প্রতীকের আশ্রয় সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য মানুষের কাছে পুরাণ অধিকতর জনপ্রিয়। এখানে সৃষ্টিতত্ত্ব,ইতিহাস,দার্শনিকতত্ত্ব ও সাধকপ্রণালীর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।এই গ্রন্থে দেব-দেবীর নামে পূজার প্রচলন,দেব-দেবীর মহাত্ম ও শ্রেষ্ঠত্ব এর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

৭. আগামশাস্ত্র: হিন্দু সমাজের মধ্যে আগামশাস্ত্রের অনেক জনপ্রিয়তা রয়েছে।কারণ আগামশাস্ত্রে নানা দেবদেবীর পূজার পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন আলোচনা করা হয়েছে।

৮. রামায়ণ : হিন্দু ধর্মের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ হল রামায়ণ । বেদের শাশ্বত সনাতন ধর্মগুলো ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীর মধ্য দিয়ে জনসমাজে প্রচার করা এ ধর্মগ্রন্থটির মুখ্য উদ্দেশ্য। রামায়ণ হল প্রাচীন ভারতীয় সূর্যবংশীয় রাজাদের কাহিনী অবলম্বণে মহর্ষি বাল্মীকি রচিত সংস্কৃত মহাকাব্য।এই গ্রন্থটির রচনাকাল খৃষ্টীয়পূর্ব ৩য় শতকে।অযোধ্যার রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্র এর জীবনী হল এই গ্রন্থের মূল কথা।এই গ্রন্থটি সাত খণ্ডে বিভক্ত।রাম,সীতা,লক্ষণ,রাবণের জীবনাতিহাস এখানে তুলে ধরা হয়েছে।এই গ্রন্থে শ্লোক সংখ্যা হল মোট ১৮৮৫৫টি।

রামায়ণের শিক্ষা: রামায়ণ এ ধর্ম, রাজধর্ম, গার্হস্থ্য ধর্ম, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সকল দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাই অধিকাংশ হিন্দু এ গ্রন্থটিকে শিক্ষা অনুযায়ী জবিনযাপন করে থাকে। এটি হিন্দুদের কাছে পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে প্রসিদ্বি লাভ করেছে।

৯. মহাভারত: হিন্দু ধর্মের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ হল  মহাভারত। বেদের শাশ্বত সনাতন ধর্মগুলো ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীর মধ্য দিয়ে জনসমাজে প্রচার করা এ ধর্মগ্রন্থটির মুখ্য উদ্দেশ্য। এটি ঋষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস কর্তৃক সংস্কৃত ভাষায় রচিত। চন্ড্রবংশীয় কুরু-পাণ্ডবদের ভ্রাতৃবিদ্বেষ ও যুদ্ব হল এর মূল উপজীব্য।বড়ভাই ধৃতরাষ্ট্র ও ছোটভাই পাণ্ডুর সন্তানদের মধ্যে কুরুক্ষেত্রে যে যুদ্ব হয় সেই যুদ্বই হল এই মহাভারতের মূল ঘটনা। যুদ্বে শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন পাণ্ডুর সন্তানদের পক্ষে। আরো সেখানে ছিলেন অর্জুন। এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে সকল উপদেশ দিয়েছেন এবং মানবকূলের প্রতিনিধি হিসেবে অর্জুন যে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তার সারাংশ হল শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা। আর তার বিস্তারিতাংশ হল মহাভারত।

মহাভারতের শিক্ষা:  মহাভারতের ধর্ম, রাজধর্ম, গার্হস্থ্য ধর্ম, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সকল দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাই অধিকাংশ হিন্দু এ গ্রন্থটির শিক্ষা অনুযায়ী জবিনযাপন করে থাকে। এই গ্রন্থে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে মিথ্যার বিরুদ্বে সত্যের জয় আর অন্যায় ও অসত্যের পরাজায় দেখানো হয়েছে।মহাভারতের চরিত্রসমূহে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাওয়া-পাওয়া,লাভ-ক্ষতি,লোভ-লালসা,আশা-নিরাশা,ধর্ম-অধর্ম ও পাপ-পূণ্যের প্রতীক।

১০. চন্ডী: চন্ডী হিন্দু ধর্মের একটি স্বতন্ত্র ধর্মগ্রন্থ এবং গীতার ন্যায় চন্ডীও হিন্দুদের নিত্য পাঠ্যবিষয়। তবে অনেকের মতে, চন্ডী মূলত স্বতন্ত্র ধর্মগ্রন্থ হলেও পুরাণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শ্রী দূর্গা দেবীর অপর নাম হল চন্ডী। চন্ডী নাম হওয়ার অন্যতম কারণ হল মহিষাসুরকে সে বধ করার সময় চন্ড(ভয়ংকর) নাম ধারন করেছিল।চন্ড্রী সংস্কৃত শব্দ।তা প্রাকৃত ভাষায় চন্ডী হয়।

চন্ডীর বৈশিষ্ট্যাবলী ১. চন্ডী,দেবী দূর্গার মূর্তি

২. পুরাণে অন্তর্গত দেব-দেবীদের মহাত্ম্যকর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৩. এর শ্লোক সংখ্যা হল ৭০০।

১১. ষড়দর্শন: হিন্দু ধর্মে মোক্ষ অনুসরণের উদ্দেশ্যে ষড়দর্শনের ব্রহ্ম, জীবজগৎ ইত্যাদি তথ্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই ষড়দর্শন মূলত সংখ্যা, যোগ, ন্যায়, বৈদিক সূত্রি, মীমাংসা, উত্তর মীমাংসার বেদান্ত দর্শন। অর্থাৎ এ ছয় দর্শন মিলেই ষড়দর্শন।

১২. উপনিষদ: উপনিষদ মূলত বেদেরই একটি অংশ। যে গ্রন্থ পাঠে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করা যায়, তাকে উপনিষদ বলে।এটি বেদের সর্বশেষ অংশ। এখান থেকে যেই জ্ঞানার্জিত হয় তা হল গুহ্যজ্ঞান নামে খ্যাত। উপ ও নি পূর্বক সদ ধাতুর উত্ত্র ক্বিপ প্রত্যয় যোগ উপনিষদ।সদ ধাতুর অর্থ হল প্রাপ্তি ও বিনাশ যা মানুষকে ব্রহ্মের নিকটবর্তী করে তাকে উপনিষদ বলা হয়।ঈশ্বর কোথায় এবং কীভাবে বিরাজমান,মানুষ অ জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক নিয়ে উপনিষদে আলোচনা করা হয়েছে।যে জ্ঞানের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সন্ধান পাওয়া যায় তাই হল উপনিষদ।উপনিষদে কেবলমাত্র ব্রহ্মা বা ঈশ্বর হল প্রধান আলোচ্য বিষয়। উপনিষদে বলা হয়েছে, যে জগতের মূলে আছেন এক ব্রহ্ম।ব্রহ্মের সাক্ষাৎ পেলেই জীবের মুক্তি ঘটে।অর্থাৎ,তিনি প্রাপ্তি একমাত্র জীবের কামনা।হিন্দু ধর্মে উপনিষদ এক যুগান্ত সৃষ্টি করেছিল-মূর্তিপূজা নয় বরং এক ঈশ্বর ভাবনার গভীর আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা যাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

 উপনিষদ সংখ্যায় অনেক। বর্তমানে ১১২ খানা উপনিষদের নাম জানা গেছে। তন্মধ্যে ১. বৃহদারণ্যক, ২. শ্বেতাশ্বেতরো, ছন্দোগ্য, ৪. কেন এবং ৫. কব, ৬.ঐতরেয়,৭.ঈশ,৮.কঠ,৯.প্রশ্ন,১০.সন্তক  উল্লেখযোগ্য।  উপনিষদের শিক্ষা: উপনিষদ গ্রন্থের মৌলিক শিক্ষা হল মানুষকে স্রষ্টার চিন্তা-চেতনার দিকে আগ্রহী করে তোলা, যাতে মানুষ তার স্রষ্টাকে চিনতে পারে।

৩.আগামশাস্ত্রঃ আগামশাস্ত্র হল হিন্দু ধর্ম গ্রন্থাবলীর মধ্যে অন্যতম একটি প্রধান গ্রন্থ।এর সাথে বেদের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু আবার তা স্বাধীন হলেও বেদ বিরোধীও নয়। আগামশাস্ত্রে বেদের বিষয়বস্তু সমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।এতে দেব-দেবীর ও পূজা অর্চনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

উপসংহার:

হিন্দু ধর্ম বিভিন্ন দেবদেবী ও জীবজগৎ সম্পর্কে আলোচনা করেছে এবং এর সাথে ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে। তবে তাদের ধর্মে মূলত কোন ঐশী বা আল্লাহর মনোনীত দূত নেই বিধায় ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধর্ম ভ্রান্ত ও মানবরচিত বলে প্রত্যাখ্যানযোগ্য। 

 

 

Related posts:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *