হিন্দু বাড়িতে ফিল্মি ইস্টাইলে অপহরণের পর লাখ লাখ টাকার মালামাল লুট।

হিন্দু বাড়িতে ফিল্মি ইস্টাইলে অপহরণের পর লাখ লাখ টাকার মালামাল লুট।

 

 

হিন্দু নিউজ : ঠাকুরদের কেন নিয়ে গেল ওরা? আমাদের অপহরণ করে ঘরের সব কিছু নিয়ে গেছে কষ্ট নেই; কিন্তু ঠাকুরদের এই অপমান (ভাঙচুর) সহ্য করতে পারছি না বাবা’পারুল রানী বিশ্বাসের কান্নাজড়িত কণ্ঠ। লুট হওয়া দেবদেবীর জন্য শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন ৮২ বছর বয়সী এই নারী। পূজার ঘরে বসে ভরদুপুরে বিলাপ করছেন তিনি। গতকাল রবিবার দুপুরের ঘটনা এটি।

ঘটনাস্থল শেরেবাংলানগর থানাধীন শ্যামলীর ২ নম্বর সড়কের ১১-গ নম্বর বাড়ি। ওই টিনশেড বাড়িটি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক মিহির চন্দ্র বিশ্বাসের বড় ভাই প্রকৌশলী সুধাংশু চন্দ্র বিশ্বাসের। সপরিবারে এখানেই বসবাস করেন মিহির বিশ্বাসও। পারুল রানী তাদের পিসি।

 

বৃদ্ধার ঘরে গিয়ে দেখা গেল, যে ঘরে এতদিন পূজা-অর্চনা হতো, যে ঘর ছিল এতদিন পূজারিদের সমাগমে মুখর, সে ঘরে এখন সুনসান নীরবতা। মেঝেতে পড়ে আছে মা-কালীর মূর্তির ভগ্নাবশেষ। কাঠে গড়া রাম-সীতা, রাধা-গোবিন্দ, গোপাল-তারকেশ্বর-শিব ঠাকুরের মূর্তি যে ঘরে ছিল, সে ঘরও ফাঁকা।

মিহির বিশ্বাস জানান, গত শনিবার সকালে পরিবারের সবাইকে ফিল্মি কায়দায় অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। এর পর লুট করে নিয়ে গেছে তাদের বাসার মূল্যবান সব মালামাল, স্বর্ণালঙ্কার, অর্থকড়ি। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৬ লাখ টাকার মালামাল। অপহরণকারীরা এতেই ক্ষান্ত হয়নি, শুধু দেবদেবীর সব মূর্তিও উঠিয়ে নিয়ে গেছে কিংবা ভেঙে দিয়ে গেছে। অপহরণকারীদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে শনিবার রাতেই তিনি শেরেবাংলানগর থানায় জনৈক মো. নুরুজ্জামানসহ অচেনা ২০ থেকে ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই অপকর্মে জড়িত সন্দেহে পুলিশ মহব্বত নামের স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য রাজনকে আটক করেছে।

ঘটনার পর থেকে মিহির বিশ্বাসের বাড়িতে বসানো হয়েছে পুলিশি পাহারা। গতকাল ওই বাড়িটিতে গিয়ে রনজু মিয়া ও নাসির নামে দুই কনস্টেবলকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। কনস্টেবলদ্বয় জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরবর্তী নির্দেশপ্রাপ্তির আগ পর্যন্ত এই বাড়ির বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিদিন দুজন করে পুলিশ সদস্য পাহারায় থাকবেন।

ন্যক্কারজনক এ ঘটনার পর শনিবার মধ্যরাত থেকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত দেশি-বিদেশি একাধিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা ভুক্তভোগীদের খোঁজখবর নিয়েছেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছেন।

অপহরণকা- সম্পর্কে মিহির বিশ্বাস আমাদের সময়কে জানান, গত শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী নুরুজ্জামান বাসার কলিংবেল চাপলে গৃহপরিচারিকা কবিতা রানী দরজা খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে নুরুজ্জামান ২০ থেকে ২৫ সন্ত্রাসী নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এ সময় বাসার কেউ ঘুমিয়ে, কেউ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। একপর্যায়ে অচেনা তিন যুবক প্রথম ঘরে অবস্থানরত মিহির বিশ্বাসের গলায় টেলিফোনের তারের মতো কিছু একটা দিয়ে প্যাঁচিয়ে ধরে হত্যা করতে উদ্যত হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ধস্তাধস্তি করতে থাকেন। এরই মধ্যে একপর্যায়ে তারা মিহিরকে বেদম মারধর করে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে এবং অপেক্ষমাণ একটি অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বসিয়ে রাখে। এর পর অস্ত্রের মুখে একে একে মিহিরের স্ত্রী সঞ্চিতা বর্মণ, পিসি পারুল রানী বিশ্বাস, গৃহপরিচারিকা কবিতা রানী ও বাসার মেহমান গোলাম মঞ্জু এবং আশ্রিতা শারমিনকে বের করে টেনেহিঁচড়ে ওই অ্যাম্বুলেন্সে ওঠায়। সন্ত্রাসীরা টানা ৪ ঘণ্টা তাদের নিয়ে মোহাম্মদপুর, খিলজি রোড, বাবর রোড, আজিজ মহল্লা, পিসিকালচার এলাকায় অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ঘুরতে থাকে। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সটির সাইরেন বাজছিল। ভয়ার্ত পারুল রানী একপর্যায়ে বুকে প্রচ- ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত, জানানো হয় অপহরণকারীদের। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপহৃত সবাইকে বাবর রোডের বি-ব্লকের সাঈম কমার্শিয়াল নামে একটি ফটোকপির দোকানের সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে সিএনজি নিয়ে বাসায় ফিরলে তারা দেখেন ঘরে মালামাল নেই। সব দেবদেবীর আসনও শূন্য। মেঝেতে পড়ে আছে কালীর মূর্তির ভগ্নাবশেষ।

 

মিহির বিশ্বাস জানান, পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তাদের অপহরণের পর সন্ত্রাসীরা দুটি ট্রাকে করে বাড়ির আসবাবপত্র, টিভি-ফ্রিজসহ মূল্যবান সব মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় রাজন নামে এক সন্ত্রাসীসহ পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু গতরাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত লুটের মালামাল উদ্ধার হয়নি।

মিহির বলেন, অনভিপ্রেত যে কোনো ঘটনা এড়াতে বাড়ির বাইরে আপাতত বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ। তিনি যোগ করেন, সব মিলিয়ে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

মিহির জানান, ১৯৯৫ সাল থেকে শ্যামলীর এই বাড়িতে তারা বসবাস করছেন। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় এই বাড়িটিতে মন্দির হিসেবে পূজা-অর্চনা দিতে আসতেন। হিন্দু সম্প্রদায়কে উৎখাত করে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা এতদিন বাড়িটির দখল নিতে মুখিয়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এটি তাদেরই কা-।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলানগর থানার এসআই শফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জমিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় রাজন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

 

Related posts:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *