১৩ বছরেও বিচার হয়নি,, বাঁশখালী সাধনপুর গ্রামের শীল পাড়ার ১১ জন হিন্দুকে নৃশংসভাবে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনাটার

 

১৩ বছরেও বিচার হয়নি,, বাঁশখালী সাধনপুর গ্রামের শীল পাড়ার ১১ জন হিন্দুকে নৃশংসভাবে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনাটার

 

সাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশে বিচারহীনতার এক নজীর বিহীন অভাব ?

দিন যায় মাস যায় ঘুরে ঘুরে বছর যায় যথারীতি মামলা মোকাদ্দমার ফাইল ও জমতে থাকে ধুলো বালি।

Hindus.news

সাম্প্রতিক সময়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর কিংবা গোবিন্দগঞ্জের সান্তালদের বিষয়টার মতোই একটা আলোচিত ইস্যু ছিলো ঘটনাটা। ঘড়ি যেমব ঘুরে,ঘুরে সময় আগায়, তেমনি একের পর এক বছর আসে আর যায়; যথারীতি মামলা মোকাদ্দামার ফাইল ও ধুলা বালি জমতে জমতে তা যথারীতি একসময় পরিত্যক্তও হয়ে যায়। বিচারহীনতার একের পর এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। আর মৌলবাদীরাও তাতে উৎসাহিত হয়ে উঠে নতুন নতুন ঘটনা ঘটানোর।

বলছিলাম বাঁশখালীর দক্ষিণ সাধনপুর গ্রামের শীল পাড়ার এক পরিবারের ১১ জন হিন্দুকে নৃশংসভাবে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনাটার কথা। ২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে তেজেন্দ্র লাল শীলের বাড়িতে সশস্ত্র হয়ে হামলা করে আগুন জ্বালিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। বাইরে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আর হুমকি দেওয়া হয় যদি কেউ নিচে নেমে আসে তাহলে পুরুষ হলে গুলি করা হবে এবং মহিলা হলে ধর্ষণ করা হবে। ওই গ্রামের অন্য হিন্দু বাড়িগুলোও একইভাবে ঘিরে রাখা হয় ওইদিন রাতে। আর হুমকি দেওয়া হচ্ছিলো কেউ বেরোনোর চেষ্টা করলে খুন করা হবে। এলাকাবাসী থানার ফোন করেও পুলিশের কোনো সহায়তা পাননি। ফলাফল, শেষপর্যন্ত তেজেন্দ্র লাল শীলের বাড়ি থেকে কেউ বের হয়ে আসেন নি; আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যান ১১ জন মানুষ।

 

সেই ১১ জনের মধ্যে একজন ছিলো মাত্র ৪ দিন আগে জন্ম নেওয়া শিশু কার্তিক। পরদিন ভোরে পুলিশ যখন গিয়ে লাশ উদ্ধার করে তখন দেখা যায় উপরে সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া গৃহবধূর প্রায় আধাপোড়া লাশ আর নিচের দিকে মাত্র ৪ দিনের শিশুটির অর্ধগলিত লাশ। মা তার শরীর দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন সন্তানকে আগুনের হাত থেকে বাঁচাতে।

ঘটনার পরদিন সাইরেন বাজিয়ে আমার বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের একের পর এক নেতা সেখানে দেখতে যান। সহায়তা এবং বিচারের আশ্বাস দেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও দেখতে গিয়েছিলেন মৃত লাশগুলো।

ঘটনার নেপথ্যে:

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে বাঁশখালী থানার কালিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান চৌধুরী এই ঘটনা ঘটান বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়। তিনি বাঁশখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং সেই সময়কার বিএনপি সরকারের আমলের প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর চাচাতো ভাই এবং প্রধান ক্যাডার।

মামলার বর্তমান অবস্থা:

প্রথম তিন দফার অভিযোগত্রে রহস্যজনকভাবে আমিন চেয়ারম্যানকে মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয় নি। পরে মামলার বাদী বিমল শীল নারাজি দিলে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
এরপর ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি ৪র্থ দফায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হলে সেবার আমিন চেয়ারম্যানকে আসামি করা হয়।(সূত্র- কালের কণ্ঠ,১১ জানুয়ারি, ২০১১)।

বিগত মোট ১৩ বছরে ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব হয়েছে! মাত্র ৯ জন!
ওই পরিবারের জীবিত দুই সদস্যের একজন এবং মামলার বাদী বিমল শীল বলেছেন,”স্বজনও হারালাম। এখন টাকা-পয়সাও সব গচ্ছা যাচ্ছে। দিন, মাস, বছর যাচ্ছে কিন্তু বিচার পাই নি। সহসা যে পাবো তারও কোনো লক্ষণ নেই।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আসামী পক্ষের বারবার সময় প্রার্থনা, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের স্থানান্তর তারপর সেখান থেকে তৃতীয় বিভাগের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটি স্থানান্তর এবং সাক্ষীদের সাড়া না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বিচার কাজ গতি হারিয়েছে।
সূত্র-দৈনিক আজাদী, ১৯ নভেম্বর, ২০১৬।

একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, দ্রুত বিচারের জন্য মামলাটিকে ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল’-এ স্থানান্তরিত করা হলেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তি কিংবা উপরের মহলের কলকাঠি নাড়ার প্রভাবে মামলাটিকে একেবারে তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটিকে স্থানান্তর করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে;-
“কেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল থেকে আবার মামলাটিকে তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়? দ্রুত বিচার হলে কার কি সমস্যা হতো?”

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভূমিকা:

ওই সময় আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিলো। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে যে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছিলো সেগুলো সচিত্র প্রতিবেদন, ব্যানার, পোস্টারর, ডকুমেন্টারি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে এবং এখনও আওয়ামী লীগের প্রচারণার অংশ। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক এবং সেক্যুলার দাবী করে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ভোটই আওয়ামী লীগের ভোট বাক্সে যায় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সেই সময় যে দু’টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার প্রচার করে আওয়ামীলীগ অসাম্প্রদায়িক দাবী করে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় করে নিয়েছিলো এবং বিএনপি-জামাতের নৃশংসতা প্রচার করেছিলো তার একটি সিরাজগঞ্জের পূর্ণিমা ধর্ষণ এবং অন্যটি বাঁশ-খালীর এই ১১ মার্ডার। যেহেতু হিন্দুদের নিয়ে ভোট ব্যবসা আওয়ামীলীগ করে, এইসব ঘটনা প্রচার করে আওয়ামীলীগ ভোট আদায় করে তাই এসব নির্যাতনের বিচার করার দায়িত্বও আওয়ামী লীগের উপরের বর্তায়। কিন্তু আওয়ামীলীগের প্রায় ৮ বছরের শাসনামলেও এই ঘটনার বিচার হয় না। সর্বসাকুল্যে ১১ টা মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ১৩ বছর পূর্ণ হলো! কিন্তু এখনো এই বাংলাদেশ তার এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে পারলো না! অথচ এই দেশ, দেশের জনগণ, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা নিজেদের গল উঁচিয়ে দাবী করে দেশটা অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ!

২০০৩ সালের এই ১১ মার্ডারের মতো সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিচার হয় না বলেই ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর সাম্প্রদায়িক হামলার মতো ঘটনা ঘটে। ঘটে বরিশালের চর কাউইয়া, পাবনার সাঁথিয়া, কুমিল্লার হোমনা, নীলফামারী, গাইবান্ধা কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরের মতো ঘটনা ঘটে। দেশের আনাচে-কানাচে দেশের প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নির্যাতিত হয় কোনো না কোনো সংখ্যালঘু।

সময় গড়ায়, মামলা মোকাদ্দামার ফাইলে ধুলা পড়ে, রাষ্ট্রীয় সার্কাসের ক্লাউনদের সার্কাস চলতে থাকে। তারপর যথারীতি আবার কোনোদিন বাঁশখালীর সাধনপুর কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরের মতো অন্য কোথাও অন্ধকার নেমে আসে। যে অন্ধকারের শেষ নাই।