পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে নিজের মেধার জোরে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব—এই কথাটিই যেন পুনরায় প্রমাণ করলেন নন্দিনী বাঁসফোর গুঞ্জন। সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভর্তি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ (ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রকৌশল) বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্যে উচ্ছ্বসিত সারা দেশের হরিজন সম্প্রদায়।
নন্দিনী বাঁসফোর গুঞ্জনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার পাওয়ার হাউজ এলাকায়। তার বাবার নাম রুবেল নাথ বাঁসফোর এবং মায়ের নাম শিল্পী রাণী বাঁসফোর। একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা নন্দিনী শৈশব থেকেই ছিলেন অত্যন্ত ধীমান ও পড়াশোনায় একনিষ্ঠ। কোনো বাঁধাই তার শিক্ষার অদম্য ইচ্ছাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
কেবল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, নন্দিনী তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন দেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান অধিকার করে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তবে বিষয় ও সামগ্রিক সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে নন্দিনী অবশেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কেই বেছে নেন এবং সেখানে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
নন্দিনীর এই সাফল্যে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে। হরিজন কমিউনিটির মুরব্বি ও সুধীজনরা বলছেন, নন্দিনীর এই অর্জন কেবল তার নিজের বা পরিবারের নয়; এটি পুরো হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য এক ঐতিহাসিক এবং অনুপ্রেরণার গল্প। দীর্ঘদিন ধরে সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে থাকা এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আগামী দিনের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে এবং সাহস জোগাতে নন্দিনী এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।
নিজের অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নন্দিনী বাঁসফোর গুঞ্জন বলেন —
"অনেক সামাজিক প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ পার করে আজকের এই অবস্থানে আসতে হয়েছে। আমার এই সাফল্যের পেছনে মা-বাবার অকুন্ঠ সমর্থন, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং নিজের কঠোর পরিশ্রমের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।"
ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি দেশ, সমাজ এবং বিশেষ করে নিজের পিছিয়ে পড়া অবহেলিত মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান বলে জানান।
নন্দিনীর এই অভূতপূর্ব সাফল্য হরিজন সম্প্রদায়ের তরুণ প্রজন্মের মনে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস সঞ্চার করেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে নন্দিনী বাঁসফোর গুঞ্জন প্রমাণ করে দেখালেন — উপযুক্ত সুযোগ ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে মেধার জোরে যেকোনো অসম্ভবকেই জয় করা সম্ভব। পুরো সম্প্রদায় ও দেশের সচেতন মহল এই অদম্য মেধাবীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছে।
