জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে দেশের বর্তমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি, মাজার ভাঙচুর এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। একই সাথে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এ দেশ হিন্দু-মুসলিম সবার। যদি দেড় কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীকে নিরাপত্তা ও অধিকার দেওয়া না যায়, তবে তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হোক; আর তা না পারলে তাদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে ফজলুর রহমান একশ্রেণীর উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সমালোচনা করে বলেন,
"একধরনের পোশাকের লোক মাঠে নেমেছে, তারা কারা আমরা চিনি। তারা ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তারা এদেশে মন্দির চায় না, রামমূর্তিও চায় না। তারা স্লোগান দেয়, 'মালাউন হিন্দুরা চলে যাক এদেশ থেকে'।"
ধর্মীয় সহনশীলতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, হিন্দুদের ৩০০ ফুট মূর্তি হোক বা মন্দির হোক, সেদিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। মুসলিম হিসেবে নিজের প্রয়োজনে ২৫ তলা মসজিদ বানানো যেতে পারে, কিন্তু অন্যের মূর্তি আর মন্দির বানাতে বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার কারও নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পীর-আউলিয়াদের মাজার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এই প্রবীণ রাজনীতিক বলেন,
"তারা মাজার চায় না। মাজারে আগুন দেয়, ভাঙচুর করে। পীরকে তারা কেন হত্যা করল? কী দোষ ছিল ওনার? তারা ভিন্নমতের কাউকে চায় না।"
এ সময় তিনি এদেশের ইসলামের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই ভূখণ্ড চৌদ্দ পুরুষ আগে হিন্দু-বৌদ্ধদের দেশ ছিল। ১২০৪ সালের পর এদেশে মুসলমানরা আসে। খাজা মইনুদ্দিন চিশতী, নিজামুদ্দিন আউলিয়া, বখতিয়ার কাকি, শাহজালাল, বায়েজিদ বোস্তামী, খান জাহান আলীসহ অসংখ্য পীর-মাশায়েখের হাত ধরে এদেশে ইসলাম এসেছে এবং মুসলমানদের বসতি গড়ে উঠেছে। অথচ আজ সেই পীরদের মাজারই গুঁড়িয়ে দিতে চাওয়া হচ্ছে।
সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফজলুর রহমান বলেন, যদি আপনারা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হন, তবে সরাসরি ব্যবস্থা নিন। কিন্তু এদেশ তো সবার। চণ্ডীদাসের বিখ্যাত কবিতা স্মরণ করে তিনি বলেন—"শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।" তিনি আহ্বান জানান, সবাই যেন মিলেমিশে এ দেশে বাস করতে পারে, যেখানে হিন্দুরা তাদের মন্দিরে পূজা-পার্বণ করবে এবং মুসলমানরা মসজিদে নামাজ-রোজা করবে; কেউ কারও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা ডিস্টার্ব করবে না।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য যখন সংসদে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তখন সচেতন সমাজ ও বিশ্লেষকদের কণ্ঠে ঝরে পড়ছে এক দীর্ঘশ্বাস। অনেকেই মনে করছেন, আজ যদি দেশের সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এভাবে মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন, তবে বাংলাদেশ আজ এক ভিন্ন ও শান্তিপূর্ণ রূপ পেত।
দুর্ভাগ্যবশত, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো (আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্যান্য দল) বিভিন্ন সময়ে ভোটব্যাংক ও রাজনৈতিক স্বার্থে কওমি মাদ্রাসা এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে তোষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই চড়া মূল্য এখন দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে গিয়ে যে 'বিষবৃক্ষ' বা দানব তৈরি করা হয়েছে, আজ তার খেসারত দিচ্ছে পুরো সমাজ ও দেশের মানসিক স্বাস্থ্য।
