খুলনা নগরীর প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক তথ্য। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক ব্যক্তির সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো এবং সম্প্রতি জোরপূর্বক হওয়া বাল্যবিয়ে মেনে না নেওয়াই নির্জনার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ শনিবার সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
পুলিশ জানায়, নিহত আরফানা হোসেন নির্জনা তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ত। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন এক ব্যক্তির সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সম্প্রতি পরিবার থেকে তার অমতে অন্য একজনের সাথে তার বাল্যবিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পরও নির্জনা তার আগের প্রেমিকের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য অনড় থাকলে পরিবারে তীব্র অশান্তি ও বাবা-মায়ের সাথে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার দিন এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা তাকে মারধর শুরু করেন। এ সময় নির্জনার বাবা আলিম হোসেন আকাশ ক্ষিপ্ত হয়ে একটি কাঠের ফালি (টুকরো) দিয়ে মেয়ের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে একমাত্র সন্তান নির্জনা।
হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা দিতে বাবা-মা যৌথভাবে নৃশংস পরিকল্পনা করেন। হত্যার পর নির্জনার মরদেহটি বাড়িতে থাকা কবুতরের খাবার বহনের একটি খালি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরা হয়। এরপর গত বুধবার (৮ জুলাই) গভীর রাতে নির্জনার বাবা আলিম হোসেন আকাশ সেই বস্তাবন্দি মরদেহটি নিজের মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের নির্জন স্থানে ফেলে রেখে আসেন।
গত বুধবার রাত ৯টার দিকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের পর পরিচয় নিশ্চিত হতে না পেরে ১০ জুলাই খুলনা সদর থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিল। পরে নির্জনার মা নিজেই থানায় গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন। তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ নির্জনার বাসায় গিয়ে মা আরিফা ইয়াসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রথমে তিনি নানাবিধ বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের ও স্বামীর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তাকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও প্রদান করেন।
সংবাদ সম্মেলনে কেএমপির পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এম এম শাকিলুজ্জামান, উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) রেজাউর রহমান, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম এবং খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলামসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার প্রধান আসামি ও কাঠের ফালি দিয়ে আঘাতকারী বাবা আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।
