নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী: কন্টেন্ট ক্রিয়েশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার নেশায় তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কতখানি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তার এক নির্মম দৃষ্টান্ত দেখা গেল নরসিংদীতে। একটি নিরীহ পথকুকুরের গলায় ইট বেঁধে ব্রিজের ওপর থেকে মেঘনা নদীতে ফেলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই নিষ্ঠুরতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
ঘটনা ও গ্রেপ্তার অভিযান
নরসিংদী মডেল থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ জুন (২০২৬ খ্রিঃ) বেলা আনুমানিক ১১:৩০ ঘটিকায় নরসিংদী সদর থানাধীন নাগরিয়াকান্দি ব্রিজের ওপর এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত যুবক মোহাম্মদ আলী (২৫), পিতা- আব্দুর রব, সাং- কামারগাঁও (থানা ও জেলা- নরসিংদী), একটি কুকুরের গলায় ইট বেঁধে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে মেঘনা নদীতে ফেলে দেয়।
সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি এই ভয়াবহ দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হলে তা নরসিংদী জেলা পুলিশের দৃষ্টিগোচর হয়। ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে মাননীয় পুলিশ সুপারের তাৎক্ষণিক নির্দেশে নরসিংদী মডেল থানার অফিসার ও ফোর্স বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এরপর আজ ২৫ জুন (২০২৬ খ্রিঃ) বিকেল আনুমানিক ১৭:০০ ঘটিকায় অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নরসিংদী মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অপরাধবিজ্ঞানীদের উদ্বেগ ও সামাজিক বার্তা
অপরাধবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, নিরীহ প্রাণীর ওপর যারা এমন সাইকোপ্যাথিক বা পৈশাচিক আচরণ করে, তারা সমাজের জন্য চরম বিপজ্জনক। কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের নামে সস্তা জনপ্রিয়তা কিংবা ভাইরালের নেশায় যারা এমন নিষ্ঠুর পথ বেছে নিচ্ছে, তারা যেকোনো সময় রাগের বশবর্তী হয়ে বা স্বার্থের জন্য নিজের বন্ধু, পরিবার বা প্রতিবেশীর বিরুদ্ধেও ভয়াবহ অপরাধ ঘটাতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: উন্নত বিশ্বে এ ধরনের আচরণকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৫ সাল থেকেই প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণকারীদের এফবিআই (FBI) এর বিশেষ নজরদারি এবং বাধ্যতামূলক কাউন্সিলিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা শুরু হয়েছে। কারণ, ইতিহাস বলে বহু দুর্ধর্ষ অপরাধী বা সিরিয়াল কিলারের অপরাধের হাতেখড়ি হয় প্রাণীদের ওপর নির্মমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে।
এই ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে বাঁচতে সরকার, পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সতর্কতা প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্ম কী করছে, সামাজিক মাধ্যমে কী কনটেন্ট ছড়াচ্ছে—সেদিকে পরিবারের নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে দেশের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং এ ধরনের নিষ্ঠুরতা বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জোর দাবি জানানো হচ্ছে।
