বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক (পূর্ণবয়স্ক) নারী ও পুরুষ সম্পূর্ণ নিজেদের ইচ্ছায় বা পারস্পরিক সম্মতিতে মেলামেশা বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ঢালাওভাবে কোনো অপরাধ নয় এবং এর জন্য কোনো শাস্তির বিধান নেই।
তবে ব্যক্তিদ্বয়ের বৈবাহিক অবস্থা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং বিশেষ কিছু পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আইনি ব্যাখ্যা ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। নিচে এই সংক্রান্ত আইনি বিধানগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. অবিবাহিত নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে
আইনি অবস্থান: দুজন অবিবাহিত পূর্ণবয়স্ক (নারীর বয়স ১৮ এবং পুরুষের বয়স ২১ বছর বা তার বেশি) ব্যক্তি যদি পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে (দণ্ডবিধি, ১৮৬০) এটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
ব্যতিক্রম (বিয়ের প্রলোভন): কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীকে "বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন" দেখিয়ে বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সম্মতি আদায় করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে তা পরবর্তীতে ধর্ষণ (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ ধারা) অথবা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী, দুই পক্ষই যদি পূর্ণ সচেতনভাবে কেবল মেলামেশা করে, তবে তা সরাসরি ধর্ষণ বলা যায় না।
২. বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে (পরকীয়া বা ব্যভিচার)
যদি মেলামেশা করা ব্যক্তিদের মধ্যে নারীটি বিবাহিত হন, তবে দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা (Adultery বা ব্যভিচার) অনুযায়ী পরিস্থিতি ভিন্ন হয়:
শাস্তির বিধান: কোনো পুরুষ যদি অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে তাঁর স্বামীর সম্মতি বা উসকানি ছাড়া স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে ওই পুরুষটি দোষী সাব্যস্ত হবেন। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।
নারীর শাস্তি: এই ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যে বিবাহিত নারীর সাথে সম্পর্ক করা হয়েছে, আইন অনুযায়ী সেই নারীকে কোনোভাবেই অপরাধী বা সহায়তাকারী (Abettor) হিসেবে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
উল্লেখ্য, বিবাহিত পুরুষ যদি কোনো অবিবাহিত নারী, বিধবা বা যৌনকর্মীর সাথে স্বেচ্ছায় মেলামেশা করেন, তবে তা এই ৪৯৭ ধারার অধীনে অপরাধ নয়। তবে এটি পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের একটি শক্ত কারণ বা গ্রাউন্ড হতে পারে।
৩. সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ
ধর্মীয় আইন: বাংলাদেশের মুসলিম বা হিন্দু পারিবারিক আইন অনুযায়ী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা "জেনা/ব্যভিচার" ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং পাপ হিসেবে গণ্য। তবে দেশের প্রচলিত দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে এই ক্ষেত্রে কোনো শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার নেই।
সামাজিক শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা: অনেক সময় স্থানীয় মানুষ বা পুলিশ "সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ" বা "জনসম্মুখে অশ্লীলতা" (দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারা) কিংবা কোনো আবাসিক হোটেলের অনৈতিক কার্যক্রমের অজুহাতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে চার দেয়ালের ভেতরে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পরিসরে দুজন প্রাপ্তবয়স্কের সম্মতিমূলক সম্পর্কের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করার আইনি সুযোগ পুলিশের সাধারণ ক্ষমতায় থাকে না।
