‘আমার ছোট ভাই গণপতির পরিবারের চারজনই খুন হলো। এখানে শুধু একটি পরিবার শেষ হয়নি, আমাদের পুরো বংশই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন ৭০ বছর বয়সী গোপিনাথ চক্রবর্তী।
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় বাড়িতে বসে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নৃশংসভাবে খুন হওয়া জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) বড় ভাই তিনি। পেশায় পুরোহিত ও মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা গোপিনাথ চক্রবর্তীই এই চার গণহত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান বাদী।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৪) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) আদ্যশ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান নিজ ভিটায় সম্পন্ন হয়। কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় আয়োজিত এই ধর্মীয় আচার ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে অংশ নিতে এসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের একমাত্র জীবিত ভাই গোপিনাথসহ উপস্থিত স্বজনেরা।
বংশের করুণ সমাপ্তি নিয়ে বিলাপ করতে করতে গোপিনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা চার ভাই ছিলাম। বড় দুই ভাই অনেক আগেই মারা গেছেন। আমি আর গণপতিই বেঁচে ছিলাম। আমার নিজের কোনো ছেলে সন্তান নেই, মারা যাওয়া বড় দুই ভাইয়েরও কোনো ছেলে ছিল না। গণপতির ছোট ছেলে প্রিয়মই ছিল আমাদের পুরো চক্রবর্তীদের বংশের একমাত্র প্রদীপ ও ছেলে সন্তান। তাকেও ঘাতকরা রেহাই দেয়নি। প্রিয়ম বেঁচে থাকলে অন্তত বংশের নামটা টিকে থাকত, এখন বংশে বাতি জ্বালানোর মতো আর কেউ রইল না। আমার বাবা হেমন্ত চক্রবর্তীর বংশ আজ চিরতরে শেষ হয়ে গেল।’
ছোট ভাইয়ের শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, গণপতি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, তখনই তাঁদের বাবা হেমন্ত চক্রবর্তী পরলোক গমন করেন। এরপর থেকে তিনি নিজে এলাকায় পুরোহিতগিরি করে অর্জিত আয় দিয়ে ছোট ভাই গণপতিকে কষ্ট করে পড়াশোনা করান। পরবর্তীতে গণপতি শিক্ষকতার সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। শুধু নিজের সংসার নয়, পুরো পরিবারের প্রতি গণপতির দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ ভাই।
উল্লেখ্য, গত ২০ আগস্ট রাতে নিজ বাড়ির ছাদে নেশা করার প্রতিবাদ করায় এবং চিনে ফেলার ভয়ে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, তরুণী মেয়ে এবং ঘুমন্ত অবুঝ শিশু প্রিয়মকে অত্যন্ত পাশবিকভাবে হত্যা করে একই এলাকার দুই ইয়াবাসেবী ঘাতক। বর্তমানে অভিযুক্ত দুজনেই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে। তবে একমাত্র প্রদীপ প্রিয়মসহ পরিবারের সবাইকে হারিয়ে দাসপাড়ার সেই বাড়িটি এখন গভীর শূন্যতা ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে আছে।
