রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত জেলা স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কন্যা আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী পুত্র আয়ুশ চক্রবর্তীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সারা দেশকে আলোড়িত করেছে। পুলিশ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই তরুণ কে গ্রেপ্তার এবং তাদের স্বীকারোক্তি উদ্ধারের ভিত্তিতে মামলাটির রহস্য উন্মোচনের দাবি জানালেও, শুরু থেকেই তাদের ব্যাখ্যা ও প্রমাণের মধ্যে একাধিক মারাত্মক অসঙ্গতি ফুঁটে উঠেছে। এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা নানা রকম প্রশ্নের উত্থাপন করেছেন।
নিচে বিভিন্ন অমিল ও উত্থাপিত প্রশ্নসমূহের একটি বিবরণ তুলে ধরা হলো —
১. চারজন মানুষকে কিভাবে দুজন নিরবে হত্যা করলো
পুলিশের দাবি: গ্রেপ্তারকৃত দুই যুবক ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। ছাদের উপর শব্দ পেয়ে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী উপরে উঠে ইয়াবা সেবনকারী ওই দুই যুবককে দেখে ফেলায় তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
সন্দেহ ও অমিল: চার সদস্যের একটি পরিবারের সবাইকে একে একে গামছা, রশি ইত্যাদি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করা হলেও কোনো ধ্বস্তাধস্তি বা চিৎকারের শব্দ প্রতিবেশীরা শুনতে পাননি। কেবল দুজন তরুণের পক্ষে চারজন সুস্থ্য-সবল মানুষকে এত নিরবে ও একে একে হত্যা করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে শিক্ষক পরিবারটির স্বজন ও স্থানীয় জনগন সহ সারাদেশের সচেতন মহল সন্দেহ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
২. পুলিশি বর্ণনার ধারাবাহিক পরিবর্তন
প্রাথমিক বক্তব্য: হত্যাকাণ্ডের পর প্রাথমিক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানিয়েছিল - গণপতি চক্রবর্তীকে ছাদে, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে সিঁড়িতে এবং ছোট ছেলে আয়ুশকে ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়।
পরবর্তী বক্তব্য: কয়েকদিন পর নতুন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ দাবি পরিবর্তন করে জানায়, গণপতিসহ তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকেও ছাদেই হত্যা করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আড়াল করার জন্য লাশ ভিতরে সরানো হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় নয়, বরং ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর হত্যাকারীদের চিনে ফেলায় ছেলে আয়ুশকে হত্যা করা হয়।
হুটহাট এই বয়ান পরিবর্তনে পুলিশের তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৩. বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ সংক্রান্ত বিভ্রাট
তদন্তের ফাঁক: ঘটনার রাতে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ইলেকট্রিশিয়ান জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ লাইনটি ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে আলাদা করা হয়েছিল।
পুলিশের যুক্তি: আসামিরা সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার ভয়ে হত্যাকাণ্ডের পরে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। তবে হত্যাকাণ্ডের আগে বিদ্যুৎ না কাটলে পরিবারের সদস্যরা ঘাতকদের কীভাবে চিনতে পারলেন না বা প্রতিরোধ গড়তে পারলেন না, তা অস্পষ্ট থেকে যায়।
৪. ডাক্তারি ও ফরেনসিক রিপোর্টের সাথে বৈপরীত্য
আঘাতের ধরন: প্রাথমিক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, কন্যা আগামী চক্রবর্তীর গলায় ও মুখে রশি টেনে এমনভাবে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল যে তাঁর চোখ বেরিয়ে যায় ও চোয়াল ভেঙে যায়।
চিকিৎসকের বক্তব্য: ফরেনসিক চিকিৎসক জানান, মরদেহে রাসায়নিক দাহ বা শারীরিক বিকৃতির কোনো বাহ্যিক আলামত নেই; বরং দুই দিন মরদেহ পড়ে থাকার কারণে পচনপ্রক্রিয়ার (Decomposition) সৃষ্টি হয়েছে।
৫. নিখোঁজ মোবাইল ফোন ও পোশাক বিভ্রাট
মোবাইল উধাও: পরিবারের চারজনের চারটি স্মার্টফোন থাকলেও পুলিশ মাত্র দুটি ফোন উদ্ধার করতে পেরেছে, যা ডিটারজেন্ট ভেজানো অবস্থায় মিলেছে। বাকি দুটি ফোনের খোঁজ মেলেনি।
পোশাকের অসঙ্গতি: আসামির পরিবার অভিযোগ করেছে, সিদ্ধার্থকে পুলিশে দেয়ার সময় তাঁর পরনে যে পোশাক (গেঞ্জি) ছিল, পরবর্তীতে পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে আড়ংয়ের ভিন্ন শার্টে তাকে দেখা যায়।
৬. নিছক মাদক সংক্রান্ত বিরোধ বনাম গভীর চক্রান্ত
পুলিশের সিদ্ধান্ত: দুই ইয়াবাসেবী হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
স্বজনদের অভিযোগ: নিহতদের পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, কোনো বড় চক্রান্ত বা জমিজমা ও সম্পত্তির বিরোধকে আড়াল করতেই দুজনকে সামনে এনে সাজানো নাটকের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।
৭. দাদা নয় সিদ্ধার্থকে কাকু ডাকতো প্রীয়ম
পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, প্রীয়ম সিদ্ধার্থকে দেখে বলে, "সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেনো?" আর এই চিনে ফেলার জন্যই প্রীয়মকে মেরে ফেলা হয়।
অথচ সিদ্ধার্থের বাবা সাংবাদিকদের বলেছেন, দাদা নয় সিদ্ধার্থকে কাকা ডাকতো প্রীয়ম।
৮. আগামী ও তার মায়ের মৃতদেহে বীর্যের উপস্থিতির দাবি
একান্ত এক সাক্ষাৎকারে ডোম জানিয়েছেন, আগামী ও তার মায়ের দেহে বীর্যের উপস্থিতি পেয়েছেন তিনি। তাকে সেই বীর্য সংরক্ষণ করতে বলায় তিনি তা সংরক্ষণ ও করেন।
ডাক্তারের ভাষ্যমতে এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি এবং ধর্ষণের কোনো চিহ্ন ও পাওয়া যায়নি।
৯. মৃত্যুর সময় ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের সময়
প্রাথমিক বিবৃতিতে বলা হয়েছিলো রাতে মেরে ফেলা হয়েছিলো পরিবারের সবাইকে। পরে তারা বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা হয়।
পরবর্তীতে, সোস্যাল মিডিয়ায় আগামীর সাথে একটি চ্যাটের স্ক্রিনশট শেয়ার হয়েছে, যেখানে আগামী বলছেন যে, সারারাত তার বাসায় বিদ্যুৎ নেই, তাই প্রায় সারারাত জেগে থেকেছে।
১০. নেশার স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশের দাবী মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে আসেন। পরে ইয়াবাসেবনকারী দুইজনকে দেখে ফেলায় গণপতি চক্রবর্তীকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে মেরে ফেলে।
অথচ পাশেই তিনতলা একটা বাড়ি রয়েছে যেটা ইয়াবা সেবনের জন্য বেশি উপযুক্ত ও নিরিবিলি, কিন্তু সেই বাড়িটি টপকে ইয়াবাসেবীরা এই বাড়িতে লাফিয়ে এসেছেন বলে বক্তব্য দিয়েছেন পুলিশ। এছাড়াও ইয়াবা সেবনের জন্য খোলা মেলা ছাদ নয় বরং বদ্ধ স্থানই ইয়াবা সেবনের জন্য উপযুক্ত বলে জানা যায়।
নিহতদের স্বজন, স্থানীয় অধিবাসী এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই অস্পষ্ট ব্যাখ্যার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে বিচারবিভাগীয় নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
