রংপুর নগরীতে শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে বর্বরোচিত ও নৃশংসভাবে হত্যার পেছনে বেরিয়ে এসেছে এক গা শিউরে ওঠার মতো রোমহর্ষক সত্য। নিজ বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবনকালে বাধা দেওয়া এবং চিনে ফেলার ভয়েই রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে একে একে হত্যা করে ঘাতকরা। ঘটনার সাথে জড়িত দুই অভিযুক্তকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আজ রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে এই চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
গ্রেপ্তারকৃত দুইজন হলো—রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।
এর আগে গতকাল শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি নিজ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) রক্তঝরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার জানান, গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দিবাগত শেষ রাতে অভিযুক্ত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ঢোকে এবং সেখানে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকে। শব্দ পেয়ে গৃহকর্তা গণপতি চক্রবর্তী ছাদে যান এবং তাদের সেখানে আড্ডা ও নেশা করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ সময় নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে ও ধরা পড়ার ভয়ে ঘাতকরা গণপতি চক্রবর্তীর গলার গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
এরপর স্বামীর চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠার চেষ্টা করলে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও একইভাবে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের আকুল চিৎকার শুনে এগিয়ে এলে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি পেঁচিয়ে গলায় ফাঁশ দিয়ে হত্যা করে ঘাতকরা। পুলিশ কমিশনার জানান, প্রার্থী চক্রবর্তীকে মারতে প্রায় ৪-৫ মিনিট সময় লেগেছিল; ঘাতকরা রশি দিয়ে তাঁর মুখ ও গলা চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সর্বশেষ, ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১২ বছরের শিশু আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে মুখে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংস বর্ণনা দিয়ে পুলিশ জানায়, চারজনকে হত্যার পর ঘাতকরা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বাসার বাথরুমে গিয়ে গোসল করে। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে ঘরে থাকা খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে বিশ্রাম নেয়। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা ঘর থেকে কিছু স্বর্ণালংকার চুরি করে বের হয়ে যায় এবং সেগুলো নিকটবর্তী একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত স্থানে লুকিয়ে রাখে। পরবর্তীতে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে এবং তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গোপন স্থান থেকে চোরাই স্বর্ণালংকার জব্দ করে।
তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এই গণহত্যাকাণ্ডকে অন্যদিকে মোড় নিতে এবং পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে ঘাতকরা ঘরের সব মালামাল এলোমেলো করে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেছিল। এমনকি নিজেদের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) যেন না থাকে, সে জন্য ঘরের দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানির বোতলে ডুবিয়ে রেখেছিল তারা। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
