আমাদের সমাজে চুরি বা ডাকাতি বাদে কোনো পেশাই ছোট নয়—হোক সে মুচি, নরসুন্দর কিংবা সুইপার। প্রতিটি সৎ পেশাই সম্মানের। কিন্তু একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ যখন যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও কেবল তথাকথিত 'নিচু জাত' হওয়ার কারণে বর্ণবাদের শিকার হয়ে কর্মস্থল থেকে বিতাড়িত হন, তখন তা সামাজিক ন্যায়বিচারের মুখে এক বড় চড়। এমনই এক নির্মম ও অমানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন তৎকালীন আমলের বিএ পাস বিষু রবি দাস।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮০ সালে। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধার জোরে বিষু রবি দাস একটি সরকারি দপ্তরে অফিস সহায়ক (পিয়ন) পদে চাকরি লাভ করেন। কিন্তু সমাজে শিকড় গেড়ে থাকা জাতিভেদ ও বর্ণবাদের কারণে শুরু থেকেই কর্মস্থলে চরম বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাকে। সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের একাংশের চোখে তিনি ছিলেন কেবলই এক 'মুচির ছেলে'। ফলে নিখুঁতভাবে কাজ করার পরও অবধারিতভাবেই তিনি পড়েন নোংরা অফিস পলিটিক্সের মুখে।
একদিন এক নিকটাত্মীয়ের গুরুতর অসুস্থতার খবর পেয়ে বিষু রবি দাস তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে মৌখিকভাবে ছুটি নিয়ে তাকে দেখতে যান। মানবিক এই সুযোগটিকে হাতিয়ার করে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বোনে জাত্যভিমানী সেই চক্রটি। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিতির মিথ্যা অজুহাত ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চাকরি রক্ষার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে কেবল 'নিচু জাতের' তকমা দিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
চাকরি হারিয়ে ও সমাজ থেকে চরম অবিচার পেয়ে নিরুপায় বিষু রবি দাস জীবিকার তাগিদে শেষ পর্যন্ত বেছে নেন তাঁর বাবার পুরোনো পেশা—মুচিগিরি। যে হাত কলম ধরে ফাইল নাড়াচাড়া করার কথা ছিল, সেই হাতকে বেছে নিতে হয় জুতো সেলাইয়ের কাজ। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে এই চরম অবিচার ও বৈষম্যের ক্ষত বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। আজ এই বয়সে এসেও তাকে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
অফিস পলিটিক্স কতখানি মারাত্মক এবং সৎ ও ডেডিকেটেড কর্মীদের কীভাবে নাজেহাল করে, বিষু রবি দাসের জীবন তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। ইঁদুরের তত্ত্বাবধানে চিটা রেখে ধানের বিচার করার মতো বিচারহীনতার সংস্কৃতিই তাকে আজ এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, সরকারের উচিত বিষু রবি দাসের এই ফাইলটি পুনরায় সচল করে পুরো ঘটনার পূর্বাপর সুষ্ঠু তদন্ত করা। যে সমস্ত কর্মকর্তা ও ষড়যন্ত্রকারী তাঁর জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের মরণোত্তর বা জীবিতাবস্থায় শাস্তির মুখোমুখি করার পাশাপাশি বিষু রবি দাসকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।
