
একাত্তরের ২১ মে: বাগেরহাটের ডাকরা কালী মন্দিরে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাগেরহাট
১৯৭১ সালের ২১ মে। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের ডাকরা গ্রাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় রচিত হয় এই জনপদে। স্থানীয় ডাকরা কালী মন্দিরের সামনে রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকিরের নির্দেশে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে হত্যা করা হয় ছয় শতাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষকে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি 'ডাকরা গণহত্যা' নামে পরিচিত, যা নৃশংসতার দিক থেকে একাত্তরের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা।
বিশ্বাসভঙ্গ ও মৃত্যুর ফাঁদ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মে মাসের শুরু থেকেই পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের ভয়ে এই অঞ্চলের হিন্দুরা দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ডাকরা গ্রামের মুসলিম লীগ নেতা ইনাম আলী শেখ, জোনাব আলী শেখ এবং দেলোয়ার হোসেন তাদের মিথ্যা আশ্বাস দেয় যে, দেশে থাকলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার আফসার উদ্দিন মন্দিরের সেবায়েত ও ভক্তদের অভয় দেয়। এই আশ্বাসে বিশ্বাস করে এবং ভারত গমনের উদ্দেশ্যে ২০ মে রাত থেকে ২১ মে পর্যন্ত বাগেরহাট, মোড়েলগঞ্জ ও বাঁশবাড়িয়া থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ডাকরা কালী মন্দির ও ঠাকুরবাড়িতে আশ্রয় নেয়।
যেভাবে ঘটানো হয় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ
২১ মে দুপুরের দিকে যখন হাজারো মানুষ সুন্দরবন হয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য জোয়ারের অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনই স্থানীয় রাজাকারদের দেওয়া খবরে কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকির ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। খুলনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এ কে এম ইউসুফের নির্দেশে রজ্জব আলী, সিরাজ মাস্টার ও মজিদ কসাই ২০-২৫ জন সশস্ত্র রাজাকার নিয়ে দুটি বড় নৌকায় করে ডাকরায় হানা দেয়।
নৌকা থেকে নেমেই তারা নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে। প্রাণভয়ে মানুষ ছোটাছুটি শুরু করলে রাজাকাররা তাদের ধরে এনে মন্দিরের সামনে জড়ো করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুরুষদের আলাদা করে মন্দিরের সামনে কাঠের ওপর মাথা রেখে একে একে জবেহ করা হয়। এমনকি জীবন বাঁচাতে শাড়ি পরে নারী সেজে লুকিয়ে থাকা পুরুষদেরও খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
ডাকরা গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী শিশির কুমার বিশ্বাস এক সাক্ষাৎকারে জানান, "ঠাকুরবাড়ির দিকে পা বাড়াতেই দেখি চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ, রক্তের বন্যা। এক ইঞ্চি মাটিও কোথাও ফাঁকা নেই। যেখানেই পা দিই সেখানেই লাশ।"
লাশের মিছিল ও ধ্বংসলীলা
গবেষক বিষ্ণুপদ বাগচীর লেখা ‘ডাকরা গণহত্যা’ বই ও স্থানীয় তথ্যানুসারে, সেদিন ৬০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম নিজেই ৪৬৪টি লাশ গণনা করেছিলেন বলে জানা যায়। মৃতদেহের বিশাল একটি অংশ খরস্রোতা মংলা ও মাদারতলী নদীতে ভেসে যায়। গণহত্যা শেষে রাজাকাররা গ্রামটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ফেরার পথে কয়েকজন তরুণীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
বর্তমান অবস্থা
যে স্থানটিতে এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলেছিল, সেই ডাকরা কালী মন্দিরটি বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যুদ্ধের পর রাজাকার রজ্জব আলী আত্মহত্যা করে এবং অন্যতম নির্দেশদাতা এ কে এম ইউসুফ বিচারের রায় কার্যকরের আগেই মারা যায়। তবে স্থানীয়দের দাবি, ডাকরা গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং এই নৃশংস ইতিহাসের সঠিক পাঠ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।