হিন্দু ভোটব্যাংকের দিকে কি জামায়াতের নতুন কৌশল? নিরাপত্তার আশ্বাসে সনাতনদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা

4 week ago
VIEWS: 153

HindusNews ডেস্ক :

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ও বিতর্কিত বাস্তবতা সামনে আসছে—ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্য করে সাংগঠনিক তৎপরতা। ঝিনাইদহ থেকে খুলনা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ‘হিন্দু সভা’, ‘সনাতনী কমিটি’ এমনকি শুধুমাত্র হিন্দুদের নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনের খবরে প্রশ্ন উঠছে, হিন্দু ভোটব্যাংকের দিকে কি জামায়াতের বিশেষ নজর পড়েছে?

ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার উমেদপুর বাজারে সম্প্রতি এমনই একটি চিত্র দেখা যায়। বিকেল গড়াতেই বাজারের পাশে খোলা জায়গায় কয়েকটি বেঞ্চে গোল হয়ে বসেন ১০-১২ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী। সেখানে স্থানীয় জামায়াত নেতা দলীয় লিফলেট বিতরণ করেন এবং সভাটিকে ‘দলীয় সভা’ বলে পরিচয় দেন। তার দাবি অনুযায়ী, উপস্থিত সবাই জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক।

উমেদপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মো. শওকত আলী জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও জামায়াতের ‘রাজনৈতিক আহ্বান’ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, “আমরা কয়েক মাস ধরে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে কাজ করছি। তারা আমাদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সমর্থক হয়েছেন।”

এই সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে কথা বলে উঠে আসে নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়টি। পাঁচই আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু বসতিতে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান তারা। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় জামায়াত নেতারা তাদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।

অমল কুমার নামের এক সনাতন ধর্মানুসারী বলেন, “ওরা বলেছে বিপদে পড়লে সহযোগিতা করবে। মোবাইল নম্বর নিয়েছে, পাশে থাকার কথা বলেছে। এই সাপোর্ট অন্যরা দেয়নি বলেই আমরা তাদের সাপোর্ট দিচ্ছি।”

জামায়াত নেতাদের বক্তব্যেও ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি বারবার উঠে আসে। শওকত আলীর দাবি, জামায়াত সংখ্যালঘুদের প্রতিবেশী হিসেবে দেখে এবং তাদের নিরাপত্তা দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব মনে করে। তিনি বলেন, “আমাদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক। তারা আমাদের কাছে ন্যায্য আচরণই পাবেন।”

জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। দলটির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, জামায়াতের গঠনতন্ত্রেই অমুসলিমদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিধান রয়েছে।

তার ভাষায়, অমুসলিমদের ক্ষেত্রে শর্ত সহজ—দলীয় শৃঙ্খলা মানা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অবৈধ উপার্জন থেকে বিরত থাকা। এসব মানলেই তারা জামায়াতের সদস্য হতে পারেন।

তবে বাস্তবতা হলো, জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নীতি-নির্ধারণী বা শীর্ষ নেতৃত্বে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের যাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “তারা তাদের নিজ নিজ কমিউনিটির ফোরামে নেতৃত্ব দেবেন। মূল জামায়াতের নেতৃত্বে আসার সুযোগ আমাদের বিধানে নেই।”

এই বক্তব্য থেকেই প্রশ্ন উঠছে—একে কতটা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি’ বলা যায়?

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার প্রায় ১০ শতাংশ। বহু সংসদীয় আসনে এই ভোটই জয়-পরাজয়ের ফয়সালা করে। পাঁচই আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ অবস্থান সংখ্যালঘু ভোটের দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শূন্যস্থানেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চায় জামায়াত। খুলনার ডুমুরিয়ায় শুধুমাত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে আয়োজিত ‘হিন্দু সম্মেলন’ ছিল কার্যত একটি নির্বাচনী জনসভা, যেখানে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রকাশ্য প্রচার চালানো হয়।

যদিও জামায়াত দাবি করছে, তারা সংখ্যালঘুদের ভোটব্যাংক হিসেবে নয়, নাগরিক হিসেবেই দেখতে চায়। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “তারা ভোটার—এটা সত্য। কিন্তু আমরা তাদের পাশে থাকতে চাই, শুধু ভোটের জন্য নয়।”

তবে এই উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখছেন সংখ্যালঘু নেতারা। বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ মনে করেন, কার্যকর ভূমিকা ছাড়া কেবল সদস্য বানানো ভোটের কৌশল মাত্র।

তার ভাষায়, “তারা একটি ধর্মভিত্তিক দল। অন্য ধর্মের মানুষকে প্রকৃত অর্থে ধারণ করার সুযোগ সেখানে নেই। দলে নিলো, কিন্তু দায়িত্ব দিলো না—এটা ক্ষণস্থায়ী রাজনীতি।”

তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় শুধু রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নয়, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ভূমিকা জরুরি। শুধু ভোটের সমীকরণ বদলালেই সংখ্যালঘুদের সমান অধিকার ও মর্যাদার সংকট মিটবে না।

জামায়াতের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তার আশ্বাস ও সাংগঠনিক অন্তর্ভুক্তির আড়ালে এটি আদৌ সংখ্যালঘুদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, নাকি আসন্ন নির্বাচনের হিসাব—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত।

to join the global Sanatani Hindu Community
Connect with Sanatani Hindus from all over the world — share, learn, and grow together.
Explore Questions, Bhajan Lyrics, Leelas, Feeds, Business Pages, Products, plus Shlokas, Events, Courses, Jobs, Marriage, Help Posts, and more.
মন্তব্য করতে Login অথবা Registration করুন