
অগ্রহায়ণ কৃষ্ণাঅষ্টমীতে দক্ষিণ দিনাজপুরে পুকুর থেকে উঠে এল চতুর্মুখ মহাকাল ভৈরবের প্রাচীন বিগ্রহ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণাঅষ্টমী তিথি—ভৈরব জয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন ব্লকে এক বিস্ময়কর ও ঐতিহাসিক প্রত্ন-আবিষ্কার ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তপন ব্লকের গুড়াইল গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ভাউর (ভাইওর) মায়ের স্থানের সংলগ্ন একটি পুকুর থেকে উঠে আসে এক অত্যন্ত প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য দেববিগ্রহ।
স্থানীয় বাসিন্দা মাথিয়াস মার্ডির চোখে প্রথম ধরা পড়ে এই পাথরের মূর্তিটি। খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও কৌতূহল তৈরি হয়। পুকুর থেকে তোলা মূর্তিটি পর্যবেক্ষণ করে স্থানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সচেতন মহলের একাংশের দাবি—এটি সর্বতোভদ্র চতুর্মুখ সংযুক্ত মহাকাল ভৈরবের বিগ্রহ।
প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, মূর্তিটি কালো বা অতি গাঢ় প্রস্তরে নির্মিত, যা দেখতে কালো ব্যাসাল্ট কিংবা ক্লোরিটিক শিস্ট পাথরের মতো। এই ধরনের পাথরের ব্যবহার পূর্ব ভারতের পাল–সেন যুগে, বিশেষত অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। সেই সূত্র ধরেই বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, এটি একটি পাল যুগীয় প্রত্নসম্পদ।
মূর্তিটির অন্যতম বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—চার দিকেই চারটি মুখসহ পূর্ণ দেহাবয়বের উপস্থিতি। এই সর্বতোভদ্র রূপ শৈবতান্ত্রিক উপাসনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল। শিল্পরীতির দিক থেকেও বিগ্রহটি অসাধারণ—গাঢ় অলঙ্করণ, সূক্ষ্ম রিলিফ কাজ, জটিল মুকুট, হার, বালা এবং শক্তিশালী অথচ আধ্যাত্মিক মুখাবয়ব প্রাচীন শাস্ত্রীয় শিল্পকলার সাক্ষ্য বহন করে।
যদিও প্রথম দর্শনে কেউ কেউ এটিকে বহু-হাতবিশিষ্ট শক্তিদেবী বা মহিষমর্দিনী দুর্গার পাল যুগীয় প্রতিমা বলেও অনুমান করছেন, তবুও স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও নামগত ব্যাখ্যা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘ভাইওর’ বা ‘ভাউর’ নামটিকে অনেকেই ‘ভৈরব’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ বলে মনে করছেন। লোককথা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে দেবতা ভৈরব লোকচক্ষুর অন্তরালে পূজিত হতেন বলেও বিশ্বাস রয়েছে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে থানার মাধ্যমে মূর্তিটি সংগ্রহ করে মিউজিয়ামে সংরক্ষণের প্রস্তাব উঠেছে। তবে গ্রামবাসীদের একান্ত ইচ্ছা, এই প্রাচীন বিগ্রহটি গ্রামেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সনাতন রীতি অনুযায়ী পূজিত হোক। তাঁদের মতে, এটি শুধুমাত্র প্রত্নসম্পদ নয়, বরং তাঁদের আস্থা ও ধর্মীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই ঘটনার পর থেকে গুড়াইল গ্রাম ও সংলগ্ন এলাকায় চরম আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন বহু মানুষ মূর্তিটি এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমাচ্ছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে এটি যেমন এক অলৌকিক প্রাপ্তি, তেমনই প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এক অমূল্য আবিষ্কার।