ইতিহাসের নির্মম সাক্ষী দুই সূর্য সন্তানকে নিয়ে গৌরবান্বিত বানারীপাড়াবাসী

4 week ago
VIEWS: 145

সুমন দেবনাথ, বরিশাল প্রতিনিধি :

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিজয়ের উষালগ্নে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হারানোর দুঃসহ বেদনার দিন এটি।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের শেষলগ্নে পুরো দেশের মানুষ যখন চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই এ দেশীয় নরঘাতক রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মেতে ওঠে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে। বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে বাঙালিকে মেধাশূন্য করার এ নৃশংস নিধনযজ্ঞ সেদিন গোটা জাতিসহ পুরো বিশ্বকেই হতবিহ্বল করে দিয়েছিল।

বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার দুই সূর্য সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমদ্দার ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। দেশ মাতৃকার জন্য আত্মোৎসর্গকারী ৭১’র প্রথম শহীদ এ দু’ই বুদ্ধিজীবী ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করে আজও এলাকাবাসীর মনের মনি কোঠায় শ্রদ্ধাভরে দেদীপ্যমান হয়ে জ্বল জ্বল করে জ্বলে আছেন।

তাদের নিয়ে গৌরবান্বিত বানারীপাড়াবাসী।‘ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেই কালরাতে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনের মতো খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার পরিবারের সদস্যরা রাত নয়টার সময় রেডিও খুলে বসে ছিলেন। ঢাকা রেডিও থেকে তারা সে রাতে দুর্যোগের কোন পূর্বাভাস পাননি। ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ শুনে ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মেয়ে ‘মেঘনার’ ঘরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ প্রিলিমিনারি এবং অনার্স পরীক্ষার্থীদের খাতা দেখতে বসলেন।

অকস্মাৎ জনতার ধুমধাম শব্দ শুনে তিনি এবং স্ত্রী বাসন্তি রানী গুহঠাকুরতা দেয়ালের বাইরে গিয়ে দেখতে পেলেন, জনতা রাস্তায় বড় বড় গাছ, পানির ট্যাঙ্ক ও ইটপাটকেল দিয়ে প্রতিরোধ তৈরি করছে। বিপদ বুঝতে পেরে তারা তাদের ফ্ল্যাটের প্রবেশপথ তালাবদ্ধ করেন। ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা রাস্তার দিকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে ভারাক্রান্ত মনে ‘বিপদ আরম্ভ হয়ে গেল’ বলে পুনরায় মেয়ের কক্ষে গিয়ে খাতা দেখতে বসে গেলেন’। রাত বারোটার দিকে ইকবাল হল এবং রোকেয়া হলের দিক থেকে বোমার আওয়াজ ভেসে আসছে। আস্তে আস্তে অসংখ্য লাইট বোমা আকাশকে আলোকিত করে দিচ্ছে,চারদিকে বোমা ও গুলি বর্ষিত হচ্ছে।

ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও তার স্ত্রী গুলি ও বোমার কানফাটা আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে খাটের তলায় বেডকভার বিছিয়ে নিরাপদে শুয়ে বর্বর পাক সেনাদের বীভৎসতার তাণ্ডব শুনছিলেন। তাদের ফ্ল্যাটটি কাঁপছিল-চারদিকে লাইট বোমার আলোর ঝলকানি। এক পাঞ্জাবী মেজর গেটের লোহার জিঞ্জির হাত দিয়ে সজোরে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে তার মেয়ে মেঘনার কক্ষের জানালার মসকুইটো নেট বেয়নেট দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে।

পাঞ্জাবী সৈন্যরা তাদের কামরার দরজায় বুটের লাথি মারছিল। এক পর্যায়ে সেই কামরায় প্রবেশ করে ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে বাম হাত চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপ প্রফেসর সাহাব হায়?’ তিনি ইংরেজিতে বললেন, ‘ইয়েস’। পাঞ্জাবী মেজর বললো, ‘আপকো লে যায়েগা’। তিনি মোটা গলায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘হোয়াই?’ মেজর তার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে টেনে বাইরে নিয়ে গিয়ে তার নাম ও ধর্ম জিজ্ঞাস করার পরে নাম জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও ধর্ম হিন্দু বলতেই গুলির শব্দ। পাক সেনারা চলে যাওয়ার পরে সিঁড়ি থেকে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ ধরাধরি করে ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে বারান্দার খাটে এলিয়ে দেওয়ার পরেও তিনি জ্ঞান হারাননি তখনও।

পরের দিন ২৬ মার্চ এবং ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত তার ক্ষত বেয়ে রক্ত ঝরছিল-বাইরে সান্ধ্য আইন বলবত থাকায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। কারফিউ উঠে যাওয়ার পরে ২৭ মার্চ সকালে কতিপয় লোকের সাহায্যে তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে কোন লোকজন ও ডাক্তার ছিল না।

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে আনার অনুমতি পাননি তার স্বজনরা। ফলে তার মৃতদেহের সৎকার করতে পারেননি। তার মৃত্যুর পরক্ষণেই পাকসেনারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘেরাও করে রাখে। ৩ এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতালের ওয়ার্ডের বারান্দায় ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃতদেহ পড়েছিলো।

জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জন্ম বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়। তার পৈতৃক নিবাস বরিশাল জেলার বানারীপাড়ায়। তার বাবার নাম কুমুদচন্দ্র গুহঠাকুরতা এবং তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন।

১৯৩৬ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে আই.এসসি. কোর্সে ভর্তি হন। এক বছর সেখানে পড়াশোনা করার পর টাইফয়েডে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণে ব্যর্থ হন। পরবর্তীকালে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন এবং ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে আই.এ.-তে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ. পাশ করেন। এরপর তিনি ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সেখান থেকে ১৯৪২ সালে তিনি বি.এ.(স্নাতক) এবং ১৯৪৩ সালে এম.এ.(স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি লাভ করেন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এম.এ. পাশ করার পরপরই ১৯৪৩ সালে গুরুদয়াল কলেজে প্রভাষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে ইংরেজি বিভাগের লেকচারার পদে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষক হিসেবে ফেলোশিপ নিয়ে তিনি লন্ডন গমন করেন এবং ১৯৬৭ সালে লন্ডন কিংস কলেজ থেকে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার পদে উন্নীত হন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা মানবেন্দ্রনাথ রায়ের রেডিকেল হিউম্যানিজমে মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।

তিনি বিভিন্ন সময়ে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজচিন্তামূলক অনেক প্রবন্ধ লেখেন। দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সমাজে তিনি অগ্রগণ্য বিবেচিত হতেন। সুইনবার্ণ, স্টার্জ মুর অ্যান্ড এলিয়ট নামের যে অভিসন্দর্ভ তিনি পি.এইচ.ডি-র জন্য লেখেন, তা ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হয়। প্রসঙ্গত ১৯৭৭ সালে বানারীপাড়া পৌর শহরে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার পৈত্রিক ভিটায় বানারীপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এদিকে বানারীপাড়ার আরেক কৃতি সন্তান সুখরঞ্জন সমাদ্দার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষক ছিলেন । মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার মানুষ হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। তিনি সংগীতচর্চা করতেন।একাত্তরের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা সুখরঞ্জন সমাদ্দারকে তার ৭১ বি বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা, পশ্চিম পাডার বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। সেনারা তাকে সেদিনই হত্যা করে বিনোদপুরের এক দিঘির পাড়ে ফেলে রাখে।

১৩ এপ্রিল হানাদার পাকিস্তানি সেনারা রাজশাহী শহরে ঢুকে পড়ে। সেদিন সন্ধ্যায় যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত একজন বাঙালি ইপিআর সেনা অন্ধকারে চুপি চুপি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাসার পেছনে এসে পানি চাচ্ছিল। সুখরঞ্জন সমদ্দার তাকে নিজ হাতে পানি খাওয়ান। ওই ইপিআর সেনাকে আশ্রয় দিলে বিপদ হতে পারে জেনেও তাকে আশ্রয় দেন। তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল।

তিনি নিজ হাতে সে স্থান বেঁধে দিয়ে সারা রাত তার সেবা করেন। রাত চারটার পর ওই যোদ্ধা চলে যান।‘পরদিন ১৪ এপ্রিল সকাল আনুমানিক সাড়ে নয়টার দিকে হানাদার সেনারা সুখরঞ্জন সমদ্দারকে ধরে নিয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন অবাঙালি চেয়ারম্যান সৈয়দ মতিউর রহমানের ইঙ্গিতেই তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘হানাদার বাহিনীর ঘাতকেরা তাকে সেদিনই নির্মমভাবে হত্যা করে বিনোদপুরে ফেলে রেখে যায়। এটা তখন তার স্ত্রী ও স্বজনরা জানতেন না। তাদের বাসায় প্রতিদিন দুধ দিতেন এক ঘোষ।

তিনি বিনোদপুরে এক দিঘির পাড়ে সুখরঞ্জন সমদ্দারের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। সে সুখরঞ্জন সমদ্দারের মৃতদেহ তার কাজলার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে উঠোনে মাটিচাপা দিয়ে রাখেন। সেদিনই সে পরিবারসহ ভারতে চলে যান। ফলে সুখরঞ্জন সমদ্দারের পরিবারকে খবর দিতে পারেননি। স্বাধীনতার পর ফিরে এসে ঘটনাটা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানান। তখন কর্তৃপক্ষ তার দেহাবশেষ সেখান থেকে তুলে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে পুনঃসমাহিত করে।’

সুখরঞ্জন সমাদ্দারের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামে। বাবা কার্তিকচন্দ্র সমাদ্দার, মা প্রফুল­বালা সমাদ্দার। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। স্থানীয় বাইশারী স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে মাট্রিক, পরে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আই পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখান থেকে বিএ (অনার্স) পাস করেন।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে এমএ করেন। পড়াশোনা শেষে প্রথমে গোপালগঞ্জ কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

এদিকে বানারীপাড়ায় একাত্তরের সূর্য সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমদ্দারের স্মৃতি রক্ষার্থে তাদের ভাস্কর্য নির্মাণ সহ তাদের সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

to join the global Sanatani Hindu Community
Connect with Sanatani Hindus from all over the world — share, learn, and grow together.
Explore Questions, Bhajan Lyrics, Leelas, Feeds, Business Pages, Products, plus Shlokas, Events, Courses, Jobs, Marriage, Help Posts, and more.
মন্তব্য করতে Login অথবা Registration করুন